সেই নবজাতককে আপন করে নিলেন আরেক দম্পতিঅভাবের পরিবারে তিন সন্তানের পর আরেকজনকে নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়বেন ভেবে নবজাতক সন্তানকে ব্যাগে ভরে নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি হলে ওই শিশুর দায়িত্ব নিয়েছেন স্থানীয় এক দম্পতি। তারা আইনগতভাবে শিশুটিকে দত্তক নিতে চান বলেও জানিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার ভোররাত দুইটার দিকে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার বক্তারকান্দি এলাকার ভাড়াবাসায় এক কন্যা শিশুর জন্ম দেন গৃহিনী রাহেনা বেগম। তার স্বামী শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী আব্দুল মালেক মিয়া রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
তাদের গ্রামের বাড়ি রংপুর জেলায়। কাজের সুবাদে বন্দরের বক্তারকান্দির ওই বাড়িটিতে গত দুই সপ্তাহ ধরে ভাড়া থাকছিলেন এ দম্পতি।
জন্মের পর তা গোপন করে ওইদিন সকালে বাজারের ব্যাগের ভেতর ভরে শিশুটিকে নদীর পাড়ে ফেলে রাখার সময় স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়েন মা রাহেনা। পরে থানা পুলিশ ও সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে মুচলেকায় শিশুটিকে নিজেদের জিম্মায় পান রাহেনা ও মালেক দম্পতি।
যদিও পরে বিষয়টি জানাজানি হলে সন্ধ্যায় বন্দরের ভাড়াবাসায় ফিরলে স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়েন ওই দম্পতি। শিশুটি তার বাবা-মায়ের কাছে কতটা নিরাপদ তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন অনেকে। পরে স্থানীয় একটি পরিবার দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে পিতা-মাতার অনাপত্তিতে তাদের হাতেই শিশুটিকে তুলে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শিশুটির লালন-পালনের দায়িত্ব নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা সুলতান মাহমুদ আপন বলেন, “আমাদের দু’টি ছেলে সন্তান। আমরা এই কন্যা সন্তানটির দায়িত্ব নিয়েছি। শিশুটিকে যখন জখম অবস্থায় ব্যাগের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়, তখনও আমার স্ত্রীই তাকে বুকের দুধ খাইয়েছে। তাকে হাসপাতালেও নিয়ে গেছি আমরা।”
“শিশুটির গলায়ও চেপে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল। তার গলায় লাল ক্ষত হয়েছিল। এখন আমাদের কাছে শিশুটি পুরোপুরি সুস্থ আছে। আমরা তাকে বাবা-মার আদরেই বড় করে তুলতে চাই”, বলেন আপন।
এদিকে, শুক্রবার দুপুরে ওই এলাকায় গিয়ে ভাড়া বাসাটিতে আব্দুল মালেক ও রাহেনা বেগম দম্পতিকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশীরা জানান, তারা আগের রাতেই বাসে রংপুরে গ্রামে ফিরে গেছেন। বাড়ির মালিকও তাদের এ বাড়িতে আর থাকতে দিতে চাচ্ছিলেন না।
বাড়ির মালিক মোজাম্মেল হককে পাওয়া না গেলেও ভাড়াটিয়া মো. মোস্তফা বলেন, মার্চের শেষদিকে দুই কক্ষের ঘরটি ভাড়া নিয়েছিলেন তারা। ঘরে কয়েকটা হাড়ি-পাতিল আর তোষক বিছানো ছিল। আর কোনো আসবাবপত্র ছিল না। ওইসব নিয়েই তারা চলে গেছেন।
স্থানীয় দু’জন নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নবজাতক শিশুকে নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী ক্ষুব্দ হয়ে ওঠে। সবাই তাদের বাড়িতে ভিড় করতে থাকে। এক পর্যায়ে বাড়িওয়ালাও বলেছে, তাদের আর এ বাড়িতে রাখবেন না। আবার শিশুটিকেও তাদের সঙ্গে দিতে নারাজ ছিল এলাকাবাসী। পরে এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের আলাপের পর ওই এলাকার বাসিন্দা ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার আমজাদ হোসেনের ছেলে সুলতান মাহমুদ আপন শিশুটিকে লালন-পালন করার দায়িত্ব নেয়।
“এলাকায় আমজাদ সাহেবের নাম-ডাক আছে। তাগো কাছেই মাইয়াটা ভালো থাকবো। মা-বাবা বাচ্চাটারে নিয়া আবার কী করতো, তার তো ঠিক নাই”, বলছিলেন অপর আরেক নারী।
এদিকে, সন্ধ্যায় মুঠোফোনে কথা হয় আব্দুল মালেকের সঙ্গে। তিনি রংপুরে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে আছেন বলে জানান। স্ত্রীকে তার বাবার বাড়িতে রেখে এসেছেন। তবে, মালেক দাবি করেন, তার স্ত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়া এবং সন্তান প্রসবের বিষয়টি তিনি জানতেন না। বিষয়টি তার স্ত্রী পরিবারের সকলের কাছেই গোপন করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
পেটের স্ফিত অংশের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেও তার স্ত্রী রাহেনা বিষয়টি শারীরিক স্থূলতা বলে এড়িয়ে যেতেন দাবি করে মালেক বলেন, “আমি আগে ঢাকা কাজ করছি। নারায়ণগঞ্জের বন্দরে কয়েকজন পরিচিত থাকায় এইখানে বাসা ভাড়া নেই। স্ত্রী আর এক ছেলেকে নিয়া উঠি। দুইটা ঘরের একটা ঘরে আমাদের গ্রামের আরেক লোক ওঠার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আসেননি। ওই ঘরেই রাতে বাচ্চা প্রসব করেন আমার স্ত্রী। কিন্তু আমাকে কিছু সে জানায়নি। পরে সব জানলাম।”
স্ত্রীর এমন আচরণের কারণ জানতে চাইলে এ ব্যক্তি বলেন, “আমাদের বিয়ে হইছে অন্তত ১৪ বছর। আর্থিক অবস্থা ভালো না, এইটা সত্য। আমার আগেরও তিনটা সন্তান আছে। আমার মা, আমার স্ত্রীরে আর সন্তান না নেওয়ার নাকি কথা বলছিল। আরেক সন্তান নিলে খাওয়ামু কি, এই ভয় থেকে নাকি আমার স্ত্রী এই কাজ করছে। কিন্তু আমি জানলে এই কাজ কখনোই করতে দিতাম না।”
“আমার বাচ্চারে আমি ‘নির্দাবি’ (কোনো দাবি-দাওয়া ছাড়াই) করে তাগো (আপন দম্পতি) হাতে তুইলা দিছি। আমি বাচ্চা বেচি নাই। কিন্তু আমার বাচ্চা তাগো কাছে থাকলে ভালো জীবন পাইবো। আমারে কইছে দেখা-সাক্ষাত নিয়া কোনো বাধা দিবো না। তাই আমি স্ট্যাম্পে সাইন কইরা আসছি”, বলেন মালেক।
প্রয়োজনে আইনগতভাবে দত্তক দেওয়ার ব্যাপারেও তিনি আগ্রহী বলে জানালেন।
বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকে অবগত ছিলেন বন্দর ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফ তালুকদার ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ফয়সাল কবীর। তাদের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার বিকেলে মুচলেকা নিয়ে বাবা-মার কাছে নবজাতক শিশুটিকে হস্তান্তর করা হয়।
শুক্রবার রাতে এ দুই কর্মকর্তা মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, “শিশুটিকে আরেক দম্পতি নিজেদের হেফাজতে নিয়েছেন। আমরা বিষয়টি মনিটর করছি। শিশুটির বাবা-মা ও বর্তমানে যাদের জিম্মায় আছে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় আছে।”
এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আগামী রোববার বসার পরিকল্পনাও করেছেন বলে জানান সমাজসেবা কর্মকর্তা ফয়সাল কবীর। তিনি বলেন, এটিকে শিশু কল্যাণ বোর্ডে তোলা যায় কিনা তাও ভাবছেন।











