ঢাকা , সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo দিঘীরপাড় তদন্ত কেন্দ্রের অভিযানে ১২৫ পিস ইয়াবাসহ ২ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার Logo ফটো সাংবাদিক ওয়ারদে রহমান’র পিতা মরহুম মজিবুর রহমান’র ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত Logo কে এই দুলাল মাদককারবারী গড -ফাদার সাধারণ জনগণ জানতে চায় Logo দক্ষ জনবলের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ডেন্টাল চিকিৎসা ‘একজন ডেন্টাল সার্জনই সব’, বাড়ছে রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি Logo নারায়ণগঞ্জে মাদক নির্মূল ও সামাজিক সচেতনতায় যুবসমাজের বিশাল সমাবেশ Logo নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা অটোরিকশা অটোটেম্পা মিশুক ও বেবি ট্যাক্সি শ্রমিক ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদের প্রতিবাদ Logo চাষাঢ়ায় ছাত্রশিবিরের অনুষ্ঠানে পটকা নিক্ষেপ, আটক ২ আজমেরী অনুসারী Logo বর্তমান সহ-সভাপতি, নতুন কমিটিতেও দাপুটে অবস্থানে সাফি ইসলাম Logo দক্ষিণ আফ্রিকায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত প্রবাসীদের বাড়িতে সায়েম আহম্মেদ; শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা Logo ফতুল্লার ৭নংওয়ার্ডের বিএনপি ও এলাকাবসীর উদ্যোগে মাদক বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল

টেকনাফে দেড় মাস ধরে বন্ধ সীমান্ত বাণিজ্য

ইয়াঙ্গুন থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরের বাণিজ্য প্রায় দেড় মাস ধরে বন্ধ রেখেছে মিয়ানমার সরকার। ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফে আসার পথে পণ্যবাহী নৌযান আটকে দেয় দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। সেটি ঠেকাতে মিয়ানমার সরকার বাণিজ্য বন্ধ রেখেছে বলে জানিয়েছেন টেকনাফের ব্যবসায়ীরা। তবে আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত রাখাইন রাজ্যের মংডুর সঙ্গে টেকনাফ বন্দরের বাণিজ্য সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে। এ অবস্থাতেও মাঝেমধ্যে বাংলাদেশি পণ্যবাহী নৌযান আটকে দেয় আরাকান আর্মি।

স্থলবন্দরের কাস্টমস কর্মকর্তা ও আমদানি-রফতানিকারকরা বলছেন, মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর সঙ্গে সে দেশের আরাকান আর্মির সংঘাতের কারণে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দুই দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে। বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশি বেকায়দায় পড়েছেন টেকনাফের ব্যবসায়ীরা।

টেকনাফ স্থলবন্দর সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ জানুয়ারি ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফ স্থলবন্দরে আসার পথে নাফ নদের জলসীমা নাইক্ষ্যংদিয়ায় তল্লাশির নামে পণ্যবাহী তিনটি নৌযান আটকে দেয় আরাকান আর্মি। চার দিন পর পণ্যবাহী দুটি নৌযান ছাড়লেও আরেকটি ছাড়ে ১৬ দিন পর। এ ছাড়া টেকনাফের উদ্দেশে রওনা দেওয়া একটি হিমায়িত মাছের বোট আকিয়াব থেকে মিয়ানমারে ফেরত যেতে বাধ্য হয়। ফলে নিরাপত্তাজনিত কারণে ১৬ জানুয়ারি থেকে ইয়াঙ্গুন-টেকনাফ সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ রেখেছে মিয়ানমার সরকার।

গত ৮ ডিসেম্বর দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ৫ নম্বর ব্যাটালিয়নের ঘাঁটি দখলের মধ্য দিয়ে রাখাইন রাজ্য শতভাগ নিয়ন্ত্রণের কথা বিবৃতি দিয়ে জানায় আরাকান আর্মি। বিবৃতিতে বলা হয়, নাফ নদের আরাকান জলসীমায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। এরপর ডিসেম্বর মাসে আর কোনও পণ্যবাহী জাহাজ টেকনাফে আসেনি। সর্বশেষ ১৬ জানুয়ারি ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফে আসার পথে নাফ নদের বদরমোকাম মোহনায় নাইক্ষ্যংদিয়ায় তল্লাশির কথা বলে পণ্যবাহী তিনটি নৌযান আটকে দেয় আরাকান আর্মি। সর্বশেষ ১০ ফেব্রুয়ারি শাহপরীর দ্বীপের গোলারচর থেকে স্পিডবোটে ধাওয়া করে কাঠবোঝাই একটি ট্রলার নিয়ে যায়। সেটি এখনও ছাড়েনি তারা।

বন্দরের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আরাকান আর্মি পণ্যবাহী তিনটি নৌযান আটকে কমিশন চেয়েছিল। পরে সেদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে দুই দফায় বেশ কয়েকদিন পর দুটি নৌযান ছেড়ে দেয়। ১৬ দিন পর ২ ফেব্রুয়ারি ছেড়ে দেওয়া নৌযানটি টেকনাফ স্থলবন্দর ঘাটে আছে। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ নৌযানটি ইয়াঙ্গুন ফেরত পাঠাতে ছাড়পত্র দিলেও আরাকান আর্মির ভয়ে সেটি এখনও ফেরত যেতে পারেনি।

এ বিষয়ে টেকনাফ স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা বি এম আব্দুল্লাহ আল মাসুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইয়াঙ্গুন থেকে আসা সর্বশেষ নৌযানের সব পণ্য খালাস হয়েছে। ফেরত যেতে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নৌযানটি এখনও ঘাটে আছে। সেটি আরাকান আর্মির কাছে ছিল ১৬ দিন। নিরাপত্তাজনিত কারণে এখনও ফেরত যায়নি। ১৬ জানুয়ারি তিনটি নৌযান আটকের পর ইয়াঙ্গুন থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোনও পণ্যবাহী নৌযান টেকনাফে আসেনি। তবে সীমিত পরিসরে চলতি বছর থেকে মংডুর সঙ্গে টেকনাফের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য চালু আছে।’

সরেজমিনে টেকনাফ স্থলবন্দর জেটিতে গিয়ে দেখা গেছে, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের তেমন কর্মব্যস্ততা নেই। ঘাটে চালভর্তি একটি ট্রলার দেখা যায়। পাশাপাশি আরেকটি ট্রলারে সিমেন্ট ও পানি লোড করা হচ্ছে।

বন্দরের শ্রমিকনেতা আজগর আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুধু মংডুর সঙ্গে টেকনাফের বাণিজ্য সচল আছে। গত দুই দিনে মংডু থেকে চার হাজার ৩০০ বস্তা পণ্য নিয়ে দুটি ট্রলার এসেছে। কিন্তু এক মাস ধরে ইয়াঙ্গুন থেকে কোনও পণ্যবাহী নৌযান আসছে না। নাফ নদে আরাকান আর্মি পণ্যবাহী নৌযান আটকে চাঁদা তোলায় ইয়াঙ্গুন থেকে কোনও পণ্য আসছে না। এতে বন্দরের শ্রমিকরা পড়েছেন বিপাকে। কাজ না থাকলে বসে থাকতে হয়। রমজান এসে গেছে। অথচ আমাদের আয়-রোজগার নেই। খুব বেকায়দায় আছি আমরা।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন্দরের এক ব্যবসায়ী বলেন, টেকনাফের ঘাটে থাকা নৌযানটি ইয়াঙ্গুনে ঠিকমতো ফেরত যাওয়ার পর নতুন করে কোনও নৌযান ছাড়বে কিনা, সে সিদ্ধান্ত জানাবে মিয়ানমার সরকার। কারণ টেকনাফে আসার পথে পণ্যবাহী নৌযান আটকে দেয় আরাকান আর্মি। মূলত আরাকান আর্মি সীমান্ত বাণিজ্যে ভাগ চায়। এখনও তাদের কাছে কাঠবোঝাই একটি ট্রলার আটক আছে। কমিশন না পেলে ছাড়বে না।’

টেকনাফ শুল্ক স্টেশন সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমার থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৯ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে বাংলাদেশে। এর বিপরীতে সরকার ২৯৫ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (গত জুলাই থেকে জানুয়ারি) ১১ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়। বিপরীতে সরকার ৯১ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। রাখাইনে সংঘাতের কারণে পণ্য আমদানি কম হওয়ায় রাজস্ব আদায় কমেছে। পাশাপাশি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় এক কোটি টাকার বিভিন্ন পণ্য রফতানি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে রফতানি হয়েছিল দুই কোটি টাকার এক হাজার ৮২৮ মেট্রিক টন পণ্য।

আমাদের মূল বাণিজ্য ইয়াঙ্গুনের সঙ্গে, কিন্তু দুঃখজনভাবে গত দেড় মাস ধরে বাণিজ্য বন্ধ রেখেছে মিয়ানমার সরকার এমনটি জানিয়েছেন টেকনাফ স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানিকারক এনামুল হক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘দেশটিতে সংঘাতের কারণে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দুই দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে। ব্যবসায়ীরা হতাশার মধ্যে আছেন। কারণ টেকনাফের অর্ধেক মানুষ ও শ্রমিক স্থলবন্দরের আয়-রোজগার দিয়ে চলছেন। দুই দেশের সরকারের এটি দ্রুত সমাধান করা জরুরি।’

এনামুল হক বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যের অধিকৃত মংডুর সঙ্গে টেকনাফের বাণিজ্য সচল আছে। সেখান থেকে ১০০ টন চাল এসেছে। আমাদের সরকারের উচিত মিয়ানমারের সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করে বাণিজ্য চালু রাখা। এতে রাজস্ব বাড়বে। না হয় এভাবে চলতে থাকলে বন্দর একসময় বন্ধ হয়ে যাবে।’

বন্দরের মাছ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স সুফিয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এম কায়সার জুয়েল বলেন, ‘দেড় মাস ধরে ইয়াঙ্গুনের সঙ্গে টেকনাফের বাণিজ্য বন্ধ। আরাকান আর্মি পণ্যবাহী নৌযান আটক করায় দেশটি সরকার ইয়াঙ্গুন থেকে পণ্য ছাড়ছে না। এটি সমাধানে দুই দেশের সরকারের এগিয়ে আসা উচিত।’

টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট টেকনাফ লিমিটেডের ব্যবস্থাপক সৈয়দ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গত দেড় মাসে ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফ স্থলবন্দরে কোনও পণ্যবাহী নৌযান আসেনি। তবে মংডু থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানি-রফতানি হচ্ছে। তাও সীমিত পরিসরে।’

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফে আসার পথে পণ্যবাহী নৌযান থেকে আরাকান আর্মি কমিশন নিচ্ছে। সেটি ঠেকাতে প্রায় দেড় মাস ধরে সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। এটি দুঃখজনক। এতে দুই দেশের ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দুই দেশ আন্তরিক না হলে ব্যবসায়ীদের লোকসান হবে। আমাদের সরকারের উচিত এটি সমাধানে মিয়ানমারের দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলা।’

আপলোডকারীর তথ্য

Rudra Kantho24

দিঘীরপাড় তদন্ত কেন্দ্রের অভিযানে ১২৫ পিস ইয়াবাসহ ২ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

টেকনাফে দেড় মাস ধরে বন্ধ সীমান্ত বাণিজ্য

আপডেট সময় ০২:৩৩:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

ইয়াঙ্গুন থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরের বাণিজ্য প্রায় দেড় মাস ধরে বন্ধ রেখেছে মিয়ানমার সরকার। ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফে আসার পথে পণ্যবাহী নৌযান আটকে দেয় দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। সেটি ঠেকাতে মিয়ানমার সরকার বাণিজ্য বন্ধ রেখেছে বলে জানিয়েছেন টেকনাফের ব্যবসায়ীরা। তবে আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত রাখাইন রাজ্যের মংডুর সঙ্গে টেকনাফ বন্দরের বাণিজ্য সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে। এ অবস্থাতেও মাঝেমধ্যে বাংলাদেশি পণ্যবাহী নৌযান আটকে দেয় আরাকান আর্মি।

স্থলবন্দরের কাস্টমস কর্মকর্তা ও আমদানি-রফতানিকারকরা বলছেন, মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর সঙ্গে সে দেশের আরাকান আর্মির সংঘাতের কারণে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দুই দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে। বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশি বেকায়দায় পড়েছেন টেকনাফের ব্যবসায়ীরা।

টেকনাফ স্থলবন্দর সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ জানুয়ারি ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফ স্থলবন্দরে আসার পথে নাফ নদের জলসীমা নাইক্ষ্যংদিয়ায় তল্লাশির নামে পণ্যবাহী তিনটি নৌযান আটকে দেয় আরাকান আর্মি। চার দিন পর পণ্যবাহী দুটি নৌযান ছাড়লেও আরেকটি ছাড়ে ১৬ দিন পর। এ ছাড়া টেকনাফের উদ্দেশে রওনা দেওয়া একটি হিমায়িত মাছের বোট আকিয়াব থেকে মিয়ানমারে ফেরত যেতে বাধ্য হয়। ফলে নিরাপত্তাজনিত কারণে ১৬ জানুয়ারি থেকে ইয়াঙ্গুন-টেকনাফ সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ রেখেছে মিয়ানমার সরকার।

গত ৮ ডিসেম্বর দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ৫ নম্বর ব্যাটালিয়নের ঘাঁটি দখলের মধ্য দিয়ে রাখাইন রাজ্য শতভাগ নিয়ন্ত্রণের কথা বিবৃতি দিয়ে জানায় আরাকান আর্মি। বিবৃতিতে বলা হয়, নাফ নদের আরাকান জলসীমায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। এরপর ডিসেম্বর মাসে আর কোনও পণ্যবাহী জাহাজ টেকনাফে আসেনি। সর্বশেষ ১৬ জানুয়ারি ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফে আসার পথে নাফ নদের বদরমোকাম মোহনায় নাইক্ষ্যংদিয়ায় তল্লাশির কথা বলে পণ্যবাহী তিনটি নৌযান আটকে দেয় আরাকান আর্মি। সর্বশেষ ১০ ফেব্রুয়ারি শাহপরীর দ্বীপের গোলারচর থেকে স্পিডবোটে ধাওয়া করে কাঠবোঝাই একটি ট্রলার নিয়ে যায়। সেটি এখনও ছাড়েনি তারা।

বন্দরের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আরাকান আর্মি পণ্যবাহী তিনটি নৌযান আটকে কমিশন চেয়েছিল। পরে সেদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে দুই দফায় বেশ কয়েকদিন পর দুটি নৌযান ছেড়ে দেয়। ১৬ দিন পর ২ ফেব্রুয়ারি ছেড়ে দেওয়া নৌযানটি টেকনাফ স্থলবন্দর ঘাটে আছে। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ নৌযানটি ইয়াঙ্গুন ফেরত পাঠাতে ছাড়পত্র দিলেও আরাকান আর্মির ভয়ে সেটি এখনও ফেরত যেতে পারেনি।

এ বিষয়ে টেকনাফ স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা বি এম আব্দুল্লাহ আল মাসুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইয়াঙ্গুন থেকে আসা সর্বশেষ নৌযানের সব পণ্য খালাস হয়েছে। ফেরত যেতে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নৌযানটি এখনও ঘাটে আছে। সেটি আরাকান আর্মির কাছে ছিল ১৬ দিন। নিরাপত্তাজনিত কারণে এখনও ফেরত যায়নি। ১৬ জানুয়ারি তিনটি নৌযান আটকের পর ইয়াঙ্গুন থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোনও পণ্যবাহী নৌযান টেকনাফে আসেনি। তবে সীমিত পরিসরে চলতি বছর থেকে মংডুর সঙ্গে টেকনাফের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য চালু আছে।’

সরেজমিনে টেকনাফ স্থলবন্দর জেটিতে গিয়ে দেখা গেছে, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের তেমন কর্মব্যস্ততা নেই। ঘাটে চালভর্তি একটি ট্রলার দেখা যায়। পাশাপাশি আরেকটি ট্রলারে সিমেন্ট ও পানি লোড করা হচ্ছে।

বন্দরের শ্রমিকনেতা আজগর আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুধু মংডুর সঙ্গে টেকনাফের বাণিজ্য সচল আছে। গত দুই দিনে মংডু থেকে চার হাজার ৩০০ বস্তা পণ্য নিয়ে দুটি ট্রলার এসেছে। কিন্তু এক মাস ধরে ইয়াঙ্গুন থেকে কোনও পণ্যবাহী নৌযান আসছে না। নাফ নদে আরাকান আর্মি পণ্যবাহী নৌযান আটকে চাঁদা তোলায় ইয়াঙ্গুন থেকে কোনও পণ্য আসছে না। এতে বন্দরের শ্রমিকরা পড়েছেন বিপাকে। কাজ না থাকলে বসে থাকতে হয়। রমজান এসে গেছে। অথচ আমাদের আয়-রোজগার নেই। খুব বেকায়দায় আছি আমরা।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন্দরের এক ব্যবসায়ী বলেন, টেকনাফের ঘাটে থাকা নৌযানটি ইয়াঙ্গুনে ঠিকমতো ফেরত যাওয়ার পর নতুন করে কোনও নৌযান ছাড়বে কিনা, সে সিদ্ধান্ত জানাবে মিয়ানমার সরকার। কারণ টেকনাফে আসার পথে পণ্যবাহী নৌযান আটকে দেয় আরাকান আর্মি। মূলত আরাকান আর্মি সীমান্ত বাণিজ্যে ভাগ চায়। এখনও তাদের কাছে কাঠবোঝাই একটি ট্রলার আটক আছে। কমিশন না পেলে ছাড়বে না।’

টেকনাফ শুল্ক স্টেশন সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমার থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৯ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে বাংলাদেশে। এর বিপরীতে সরকার ২৯৫ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (গত জুলাই থেকে জানুয়ারি) ১১ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়। বিপরীতে সরকার ৯১ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। রাখাইনে সংঘাতের কারণে পণ্য আমদানি কম হওয়ায় রাজস্ব আদায় কমেছে। পাশাপাশি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় এক কোটি টাকার বিভিন্ন পণ্য রফতানি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে রফতানি হয়েছিল দুই কোটি টাকার এক হাজার ৮২৮ মেট্রিক টন পণ্য।

আমাদের মূল বাণিজ্য ইয়াঙ্গুনের সঙ্গে, কিন্তু দুঃখজনভাবে গত দেড় মাস ধরে বাণিজ্য বন্ধ রেখেছে মিয়ানমার সরকার এমনটি জানিয়েছেন টেকনাফ স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানিকারক এনামুল হক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘দেশটিতে সংঘাতের কারণে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দুই দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে। ব্যবসায়ীরা হতাশার মধ্যে আছেন। কারণ টেকনাফের অর্ধেক মানুষ ও শ্রমিক স্থলবন্দরের আয়-রোজগার দিয়ে চলছেন। দুই দেশের সরকারের এটি দ্রুত সমাধান করা জরুরি।’

এনামুল হক বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যের অধিকৃত মংডুর সঙ্গে টেকনাফের বাণিজ্য সচল আছে। সেখান থেকে ১০০ টন চাল এসেছে। আমাদের সরকারের উচিত মিয়ানমারের সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করে বাণিজ্য চালু রাখা। এতে রাজস্ব বাড়বে। না হয় এভাবে চলতে থাকলে বন্দর একসময় বন্ধ হয়ে যাবে।’

বন্দরের মাছ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স সুফিয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এম কায়সার জুয়েল বলেন, ‘দেড় মাস ধরে ইয়াঙ্গুনের সঙ্গে টেকনাফের বাণিজ্য বন্ধ। আরাকান আর্মি পণ্যবাহী নৌযান আটক করায় দেশটি সরকার ইয়াঙ্গুন থেকে পণ্য ছাড়ছে না। এটি সমাধানে দুই দেশের সরকারের এগিয়ে আসা উচিত।’

টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট টেকনাফ লিমিটেডের ব্যবস্থাপক সৈয়দ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গত দেড় মাসে ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফ স্থলবন্দরে কোনও পণ্যবাহী নৌযান আসেনি। তবে মংডু থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানি-রফতানি হচ্ছে। তাও সীমিত পরিসরে।’

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফে আসার পথে পণ্যবাহী নৌযান থেকে আরাকান আর্মি কমিশন নিচ্ছে। সেটি ঠেকাতে প্রায় দেড় মাস ধরে সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। এটি দুঃখজনক। এতে দুই দেশের ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দুই দেশ আন্তরিক না হলে ব্যবসায়ীদের লোকসান হবে। আমাদের সরকারের উচিত এটি সমাধানে মিয়ানমারের দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলা।’