এম এইচ তালুকদার : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সুপারিশকৃত জনবল কাঠামো উপেক্ষা করে দেশের অধিকাংশ ডেন্টাল ক্লিনিক ও ব্যক্তিগত চেম্বারে পরিচালিত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ছাড়াই শুধুমাত্র একজন ডেন্টাল সার্জনের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় চিকিৎসাসেবার মান যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত WHO-এর ১:৩:৫ জনবল অনুপাত অনুযায়ী একজন ডেন্টাল সার্জনের সঙ্গে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী—যেমন নার্স, ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারী ও অন্যান্য সহায়ক কর্মী—থাকার সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেশের অধিকাংশ ডেন্টাল ক্লিনিক ও চেম্বারে এই মানদণ্ডের কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বহু ডেন্টাল ক্লিনিকে একজন ডেন্টাল সার্জন ও একজন অপ্রশিক্ষিত সহকারী দিয়েই পুরো চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীর পরিবর্তে ল্যাব বয় বা অদক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে স্কেলিং, দাঁতের ইমপ্রেশন (মাপ) নেওয়া, ক্যাপ ও ব্রিজ বসানোসহ সংবেদনশীল চিকিৎসাকাজ করানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে, কিছু নিবন্ধিত ডেন্টাল সার্জন খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা পেশাগত প্রশিক্ষণবিহীন ব্যক্তিদের রোগীর মুখে সরাসরি চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট কাজ করতে দিচ্ছেন। এমনকি অষ্টম শ্রেণি বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন ল্যাব কর্মীদের দিয়ে দাঁতের মাপ নেওয়া এবং কৃত্রিম দাঁত বা ক্যাপ বসানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করানোর ঘটনাও পাওয়া গেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী দাঁতের ইমপ্রেশন গ্রহণ, প্রস্থেটিক্স ফিটিং ও রোগীর মুখে ক্যাপ বা ব্রিজ স্থাপন অত্যন্ত সংবেদনশীল চিকিৎসা প্রক্রিয়া, যা প্রশিক্ষিত ও যোগ্য ডেন্টাল পেশাজীবীর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হওয়া উচিত।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ল্যাব কর্মী রোগীর মুখে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট কাজ করছেন, আর ডেন্টাল সার্জন পাশে বসে মোবাইলে ব্যস্ত রয়েছেন। ভিডিওটি প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অদক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে এ ধরনের চিকিৎসা পরিচালিত হলে মাড়ির সংক্রমণ, ভুল মাপে ক্যাপ বা ব্রিজ বসানোর কারণে পাশের সুস্থ দাঁতের ক্ষতি, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা এবং চিকিৎসাজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া যথাযথ জীবাণুমুক্তকরণ (Sterilization) প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগীদের নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ডেন্টাল ক্লিনিক ও ব্যক্তিগত চেম্বারগুলোতে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিয়োগ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন, কার্যকর নজরদারি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।









