মোঃ মামুন হোসেন: ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বৈষম্য, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, জবাবদিহির ঘাটতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট একসময় রাজপথে বিস্ফোরিত হয়েছিল। অসংখ্য মানুষের অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা সেই আন্দোলনকে শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনায় সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং রাষ্ট্র ও রাজনীতির চরিত্র নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।কিন্তু সেই পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনো সামনে—রাজনীতি কি সত্যিই বদলাবে, নাকি শুধু ক্ষমতার চেয়ারে বসা মানুষ বদলাবে?যদি পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিই নতুন নামে, নতুন মুখে কিংবা নতুন ব্যানারে ফিরে আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এত রক্ত, এত আত্মত্যাগ, এত মানুষের স্বপ্নের মূল্য কোথায়?
গণঅভ্যুত্থানের মূল শিক্ষা ছিল ক্ষমতার জবাবদিহি। জনগণ এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চেয়েছিল যেখানে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, পরিবার, দল কিংবা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হবে না। ক্ষমতা হবে জনগণের দেওয়া দায়িত্ব; সরকার হবে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হবে নাগরিকের অধিকার রক্ষার নিরপেক্ষ কাঠামো।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা যদি আবার সেই পুরোনো বৃত্তে ফিরে যায়—যেখানে ক্ষমতা মানেই প্রভাব, প্রভাব মানেই সুবিধা, আর দলীয় পরিচয় মানেই বিশেষ সুযোগ—তাহলে পরিবর্তনের মৌলিক উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু ব্যক্তি নয়, ক্ষমতার সংস্কৃতি। একজন শাসক চলে গেলে আরেকজন শাসক আসতে পারেন; একটি দল ক্ষমতা হারিয়ে অন্য দল ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা ব্যবহারের পদ্ধতি যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। একই প্রশাসনিক আধিপত্য, একই দলীয়করণ, একই পৃষ্ঠপোষকতা, একই দুর্নীতির সুযোগ এবং একইভাবে বিরোধী মতকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার প্রবণতা ফিরে এলে সেটি কোনো অর্থবহ রাজনৈতিক পরিবর্তন হতে পারে না।
তাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হওয়া উচিত—ক্ষমতার হাতবদল নয়, ক্ষমতার চরিত্রের পরিবর্তন।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তন স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সরকার বদলালেও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা বজায় থাকে। নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।কারণ ব্যক্তি যতই সৎ হোন, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে না।
গণঅভ্যুত্থানের পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ। অথচ রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক যোগাযোগ যদি মানুষের অধিকার পাওয়ার প্রধান চাবিকাঠি হয়ে ওঠে, তাহলে বৈষম্যের কাঠামো অটুটই থেকে যায়। শুধু ক্ষমতাবানদের পরিচয় বদলালে সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবতা বদলায় না।একইভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান শুধু বক্তৃতা বা রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দুর্নীতির উৎস কোথায়, কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, কীভাবে সরকারি সম্পদ অপচয় হয়—এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হতে হবে দল-মত-পরিচয় নির্বিশেষে। অন্যথায় দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্যও একসময় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হবে।এখানে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীনদের প্রশংসা করা সাংবাদিকতার কাজ নয়, আবার অন্ধ বিরোধিতাও সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য নয়। সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো প্রশ্ন করা, তথ্য যাচাই করা, ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা এবং জনগণের কথা তুলে ধরা। একইভাবে নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো সরকার বা বিরোধী দল—কাউকেই অন্ধ সমর্থন না করে নীতি ও কর্মের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা।
সবচেয়ে জরুরি হলো, তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নকে রাজনৈতিক প্রতীকে সীমাবদ্ধ না করা। যারা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে এসেছিল, তারা শুধু একটি নতুন সরকার দেখতে চায়নি; তারা একটি নতুন রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি প্রত্যাশা করেছে। তারা এমন ভবিষ্যৎ চেয়েছে যেখানে যোগ্যতা পরিচয়ের কাছে পরাজিত হবে না, আইনের প্রয়োগ ক্ষমতাবানের জন্য আলাদা হবে না এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পদ হবে না।এ কারণেই আজকের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ক্ষমতায় আসা নয়—ক্ষমতায় এসে ক্ষমতার অপব্যবহার না করা।
যে কোনো রাজনৈতিক দল যদি মনে করে জনগণের আন্দোলন তার জন্য কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি, তাহলে সেটি ইতিহাসের শিক্ষা ভুল করবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হলে একসময় সেই জনগণই প্রশ্ন করবে। গণতন্ত্রে জনগণের সেই প্রশ্নই সবচেয়ে শক্তিশালী জবাবদিহি।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। এই সুযোগকে যদি কেবল ক্ষমতার পুনর্বণ্টনে সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে ইতিহাসের কাছে আমরা ব্যর্থ হব। পরিবর্তনের অর্থ হতে হবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়ানো, দুর্নীতি কমানো, বৈষম্য হ্রাস করা এবং নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করা।
কারণ একটি বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনে মাপা যায় না; তার প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় পরবর্তী রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক হলো—তার ওপর।আজ তাই প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি নয়; রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং আমাদের সবার প্রতি—
২০২৪-এর আত্মত্যাগ কি কেবল নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরির জন্য ছিল, নাকি সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেওয়ার জন্য?যদি উত্তর হয় দ্বিতীয়টি, তবে পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতিকে নতুন মোড়কে ফিরতে দেওয়া যাবে না। জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে হবে। ক্ষমতাকে দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। রাষ্ট্রকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে তুলতে হবে। আর যারা ক্ষমতায় যাবেন, তাদের মনে রাখতে হবে—জনগণ ক্ষমতা দেয়, জনগণই তার হিসাব নেয়।
২০২৪-এর রক্ত ও আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন বাংলাদেশ শুধু শাসক বদলাবে না—শাসনের সংস্কৃতিও বদলাবে।
ঢাকা
,
রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতি কি আবার পুরোনো পথে?
-
রুদ্রকন্ঠ ডেস্ক : - আপডেট সময় ০৩:৫২:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
- 0









