ঢাকা , রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ছন্নছাড়া ব্যাটিংয়ে নিউজিল্যান্ডের কাছে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ Logo ইরানের সঙ্গে খুব বেশি ‘গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য’ নেই: ট্রাম্প Logo আগামীতে হজের খরচ আরও কমানোর আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর Logo ডিজেলের অভাবে বন্দর ঘাটে ট্রলার বন্ধের আশঙ্কা ইজারাদারের Logo শীতলক্ষ্যাকে বদলাতে না পারলে পরিবর্তন সম্ভব নয়: সাখাওয়াত Logo স্ত্রীকে নিয়ে ঈদে গ্রামে যাবার কথা রানার, বাড়ি ফিরলো লাশ Logo অন্যায়কারী আমার দলের হলেও প্রশ্রয় দেবেন না: এমপি আল আমিন Logo নারায়ণগঞ্জ শহরজুড়ে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে যত্রতত্র ইন্টারনেট ও ডিস সংযোগের তারের জট জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি Logo দুলাল চন্দ্র দেবনাথের প্রতিবাদলিপি Logo আ. লীগ সরকারের রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে: আইনমন্ত্রী

দূর্নীতিবাজ আমলাদের কাছে রাজনীতিবীদরা জিম্মি

মোঃ মামুন হোসেন : সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। কিন্তু যখন এই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। আমাদের দেশে একটি প্রচলিত বাস্তবতা হলো—দূর্নীতিবাজ আমলাদের কাছে ঘুষখোর রাজনীতিবিদরা যেন পিতৃতুল্য অভিভাবকের মতো ভূমিকা পালন করে। এই সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি গভীর ও সুসংগঠিত দুর্নীতির চক্র, যা রাষ্ট্রের উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং জনগণের অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।প্রথমত, রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন। তাদের হাতে থাকে নীতি নির্ধারণ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। অন্যদিকে, আমলারা এই নীতিগুলোর বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন। যখন রাজনীতিবিদরা সৎ ও নৈতিক হন, তখন আমলাদের কাজও হয় স্বচ্ছ ও জনগণমুখী। কিন্তু যখন রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিগ্রস্ত হন, তখন তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আমলাদের ব্যবহার করেন। ফলে, আমলারা রাজনীতিবিদদের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে নিজেরাও দুর্নীতির পথে হাঁটে।দ্বিতীয়ত, ঘুষখোর রাজনীতিবিদরা অনেক সময় দুর্নীতিবাজ আমলাদের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেন। কোনো আমলা যদি অনিয়ম বা দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন, তাহলে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে তারা শাস্তি থেকে রক্ষা পান। এই আশ্রয়দাতা রাজনীতিবিদদের কারণে আমলারা নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করে এবং আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এভাবে রাজনীতিবিদ ও আমলাদের মধ্যে এক ধরনের পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেখানে একজন অপরজনকে রক্ষা করে এবং সুবিধা ভাগাভাগি করে।
তৃতীয়ত, এই সম্পর্কের ফলে প্রশাসনে জবাবদিহিতার অভাব সৃষ্টি হয়। যখন কোনো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তখন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হয় বা তা ধামাচাপা দেওয়া হয়। এতে করে সাধারণ জনগণ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থা কমে যায়। একসময় জনগণ মনে করতে শুরু করে যে, আইন কেবল দুর্বলদের জন্য প্রযোজ্য, আর ক্ষমতাবানরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে।চতুর্থত, এই দুর্নীতির চক্র দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়, কাজের মান খারাপ হয় এবং সময়মতো প্রকল্প শেষ হয় না। এর ফলে রাষ্ট্রের সম্পদ অপচয় হয় এবং জনগণ প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এমন পরিবেশে বিনিয়োগ করতে অনীহা প্রকাশ করে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।পঞ্চমত, এই পরিস্থিতি সামাজিক নৈতিকতাকে ধ্বংস করে। যখন মানুষ দেখে যে দুর্নীতিবাজরা শাস্তি না পেয়ে বরং আরও ক্ষমতাবান হয়ে উঠছে, তখন সাধারণ মানুষও নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হতে শুরু করে। তারা মনে করে, সৎ পথে চললে সফল হওয়া কঠিন, আর দুর্নীতির মাধ্যমেই দ্রুত উন্নতি সম্ভব। ফলে সমাজে অসততা ও অনৈতিকতার প্রবণতা বাড়তে থাকে।তবে এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, শক্তিশালী ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই দুর্নীতির বিচার করা যায়। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে, যারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। চতুর্থত, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে।দূর্নীতিবাজ আমলাদের কাছে ঘুষখোর রাজনীতিবিদরা যদি পিতৃতুল্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য এক ভয়াবহ সংকেত। এই সম্পর্ক ভাঙতে না পারলে উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও সুশাসন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই এখনই সময়—দুর্নীতির বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর এবং একটি সৎ, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গড়ে তোলার।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ছন্নছাড়া ব্যাটিংয়ে নিউজিল্যান্ডের কাছে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ

দূর্নীতিবাজ আমলাদের কাছে রাজনীতিবীদরা জিম্মি

আপডেট সময় ১০:৫২:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

মোঃ মামুন হোসেন : সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। কিন্তু যখন এই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। আমাদের দেশে একটি প্রচলিত বাস্তবতা হলো—দূর্নীতিবাজ আমলাদের কাছে ঘুষখোর রাজনীতিবিদরা যেন পিতৃতুল্য অভিভাবকের মতো ভূমিকা পালন করে। এই সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি গভীর ও সুসংগঠিত দুর্নীতির চক্র, যা রাষ্ট্রের উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং জনগণের অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।প্রথমত, রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন। তাদের হাতে থাকে নীতি নির্ধারণ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। অন্যদিকে, আমলারা এই নীতিগুলোর বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন। যখন রাজনীতিবিদরা সৎ ও নৈতিক হন, তখন আমলাদের কাজও হয় স্বচ্ছ ও জনগণমুখী। কিন্তু যখন রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিগ্রস্ত হন, তখন তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আমলাদের ব্যবহার করেন। ফলে, আমলারা রাজনীতিবিদদের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে নিজেরাও দুর্নীতির পথে হাঁটে।দ্বিতীয়ত, ঘুষখোর রাজনীতিবিদরা অনেক সময় দুর্নীতিবাজ আমলাদের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেন। কোনো আমলা যদি অনিয়ম বা দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন, তাহলে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে তারা শাস্তি থেকে রক্ষা পান। এই আশ্রয়দাতা রাজনীতিবিদদের কারণে আমলারা নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করে এবং আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এভাবে রাজনীতিবিদ ও আমলাদের মধ্যে এক ধরনের পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেখানে একজন অপরজনকে রক্ষা করে এবং সুবিধা ভাগাভাগি করে।
তৃতীয়ত, এই সম্পর্কের ফলে প্রশাসনে জবাবদিহিতার অভাব সৃষ্টি হয়। যখন কোনো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তখন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হয় বা তা ধামাচাপা দেওয়া হয়। এতে করে সাধারণ জনগণ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থা কমে যায়। একসময় জনগণ মনে করতে শুরু করে যে, আইন কেবল দুর্বলদের জন্য প্রযোজ্য, আর ক্ষমতাবানরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে।চতুর্থত, এই দুর্নীতির চক্র দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়, কাজের মান খারাপ হয় এবং সময়মতো প্রকল্প শেষ হয় না। এর ফলে রাষ্ট্রের সম্পদ অপচয় হয় এবং জনগণ প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এমন পরিবেশে বিনিয়োগ করতে অনীহা প্রকাশ করে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।পঞ্চমত, এই পরিস্থিতি সামাজিক নৈতিকতাকে ধ্বংস করে। যখন মানুষ দেখে যে দুর্নীতিবাজরা শাস্তি না পেয়ে বরং আরও ক্ষমতাবান হয়ে উঠছে, তখন সাধারণ মানুষও নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হতে শুরু করে। তারা মনে করে, সৎ পথে চললে সফল হওয়া কঠিন, আর দুর্নীতির মাধ্যমেই দ্রুত উন্নতি সম্ভব। ফলে সমাজে অসততা ও অনৈতিকতার প্রবণতা বাড়তে থাকে।তবে এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, শক্তিশালী ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই দুর্নীতির বিচার করা যায়। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে, যারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। চতুর্থত, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে।দূর্নীতিবাজ আমলাদের কাছে ঘুষখোর রাজনীতিবিদরা যদি পিতৃতুল্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য এক ভয়াবহ সংকেত। এই সম্পর্ক ভাঙতে না পারলে উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও সুশাসন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই এখনই সময়—দুর্নীতির বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর এবং একটি সৎ, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গড়ে তোলার।