মোঃ মামুন হোসেন : প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। সময় বাঁচিয়েছে, শ্রম কমিয়েছে, যোগাযোগকে করেছে দ্রুততর। কিন্তু এই অগ্রগতির আরেকটি দিকও আছে। প্রযুক্তির অবিরাম অগ্রযাত্রায় আমাদের জীবনের কত পরিচিত অনুষঙ্গ, কত লোকজ ঐতিহ্য, কত স্মৃতি ও সম্পর্ক ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। উন্নতির হিসাব করতে গিয়ে আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি—কী হারিয়ে এগিয়ে চলেছি?একসময় গ্রামের ঘরে মাটির কলস, মাটির হাঁড়ি-বাটি, বদনা, লোটা-ঘটি ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। কুপি, শৈলতা, হ্যারিকেন কিংবা হেজাক বাতির আলোয় সন্ধ্যা নামত অন্যরকম আবেশ নিয়ে। পালের নৌকা, গুনটানা নৌকা, গরুর গাড়ি, হালের লাঙল, মই—এসব শুধু ব্যবহার্য সামগ্রী ছিল না; এগুলো ছিল আমাদের কৃষি, যোগাযোগ ও গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সিঁকা, পাটের শাড়ি, লুঙ্গি, পাটের বস্তা, পাটের থলে, তালের পাখা, ডোঙা, টোপর, মাথাল—প্রতিটি উপকরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি সময়, একটি জীবনধারা এবং একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়। আজ এগুলোর অনেকটাই দৈনন্দিন জীবন থেকে বিদায় নিয়েছে। কোথাও কোথাও কেবল স্মৃতি, লোকজ জাদুঘর কিংবা প্রবীণ মানুষের গল্পে তাদের অস্তিত্ব টিকে আছে।হারিয়ে গেছে আরও অনেক কোমল স্মৃতি। প্রেম নিবেদনের সেই রুমাল, কনের হাতে সেলাই করা বর্ণিল নকশা, সুঁই-সুতার কাজে মনের কথা প্রকাশের ঐতিহ্য—এসব যেন এখন অতীতের কোনো গল্প। কুশি-কাঁটার গেঞ্জি, টুপি, সোয়েটার, নকশিকাঁথার বাহারি বুনন কিংবা বকুল ফুলের মালাবদল—এসবের মধ্যে যে আন্তরিকতা ছিল, তা আধুনিক পণ্যের চাকচিক্যে সহজে ফিরে আসে না।খড়ম, জলচকি, কাঠের পিঁড়ি, বেতের ঝুড়ি, কুলা, শিল-নোড়া—এসব ছিল আমাদের ঘরসংসারের পরিচিত চিত্র। মরিচ বাটার শিল-নোড়ার শব্দ, উঠানে ধান ঝাড়ার দৃশ্য, পিঠা তৈরির আয়োজন—এসবের মধ্যেই ছিল পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক অংশগ্রহণ। আজ নানা ধরনের পিঠার ঐতিহ্যও অনেক পরিবারে উৎসবের বিশেষ আয়োজন ছাড়া আর নিয়মিত দেখা যায় না।প্রযুক্তি আমাদের শিক্ষাজীবনের চিত্রও বদলে দিয়েছে। বাঁশের কঞ্চির কলম, কালির দোয়াত, শ্লেট-পেন্সিল, ঝর্ণা কলম—উইনসন, পাইলট, মার্কার, হোয়াইট ফেদার—একসময় শিক্ষার্থীদের পরিচিত সামগ্রী ছিল। খাতার পাতায় সুন্দর করে লেখা, কলমের নিবে কালি ভরা, ভুল হলে কাগজে দাগ কেটে সংশোধন করা—এসব অভিজ্ঞতা এখন ক্রমেই বিরল। ডিজিটাল পর্দা ও কিবোর্ডের যুগে হাতের লেখার সঙ্গে যে আবেগ ও ব্যক্তিগত পরিচয় জড়িয়ে ছিল, তারও পরিবর্তন ঘটেছে।তবে প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মানুষের সম্পর্কের ওপর। একসময় সন্ধ্যার পর পরিবারে বসত গল্পের আসর। উঠানে চাঁদের আলো পড়ত, শিশুরা শুনত চাঁদের বুড়ির গল্প। বন্ধুরা আড্ডা দিত, নদীর পাড়ে বসে জীবনের গল্প করত। বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানোর খসখস শব্দ, নিঃসঙ্গ রাতে নির্মল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা কিংবা নদীর ঢেউয়ের রূপালি দৃশ্য—এসব ছিল জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ।আজ সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে মোবাইল ফোনের পর্দা।
একই ঘরে বসে থাকা মানুষগুলো অনেক সময় একই পরিবারের হয়েও ভিন্ন ভিন্ন ভার্চুয়াল জগতে বসবাস করে। মুখোমুখি কথোপকথনের বদলে আসে ছোট্ট বার্তা, ফোনকল, ইমোজি, হাই-হ্যালো। যোগাযোগ বেড়েছে, কিন্তু সবসময় কি বেড়েছে হৃদ্যতা? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত পরিচিতি তৈরি হলেও বাস্তব জীবনে নির্ভর করার মতো মানুষের সংখ্যা অনেক সময় কমে যায়।শিশুর ঘুমপাড়ানি গল্পের জায়গা নিয়েছে ভিডিও। মায়ের মুখে শোনা গল্পের বদলে শিশুর চোখ আটকে থাকে পর্দায়। ফলে প্রযুক্তি শুধু সময়ের ব্যবহার বদলায়নি; বদলে দিয়েছে শৈশবের অভিজ্ঞতাও। শিশুর কল্পনা, পারিবারিক গল্প, দাদা-দাদি বা নানা-নানির সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ—এসবের জায়গা সংকুচিত হলে একটি প্রজন্ম তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্মৃতির বড় অংশ হারাতে পারে।নারী-পুরুষের সম্পর্কেও প্রযুক্তির প্রভাব স্পষ্ট। একসময় সংসারের মানুষগুলো দিনের শেষে একসঙ্গে বসত, গল্প করত, সুখ-দুঃখ ভাগ করত। এখন একই ঘরে থেকেও প্রত্যেকে নিজ নিজ পর্দায় ব্যস্ত থাকতে পারে। ফলে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকে, কিন্তু গভীর মনোযোগ ও আন্তরিক কথোপকথন কমে যেতে পারে।
তবে দায় শুধু প্রযুক্তির নয়। প্রযুক্তি একটি মাধ্যম; সেটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সিদ্ধান্তটি মানুষের। মোবাইল ফোন সম্পর্ক নষ্ট করতেই হবে—এমন নয়। বরং সচেতন ব্যবহারে প্রযুক্তিই সম্পর্ককে আরও কাছে আনতে পারে। দূরের মানুষকে কাছে পাওয়া, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, জরুরি তথ্য পাওয়া—এসব প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবদান।সমস্যা তখনই, যখন প্রযুক্তি জীবনের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে এবং মানুষ তার নিজের সময়, মনোযোগ ও সম্পর্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়।তাই আমাদের প্রয়োজন প্রযুক্তিবিরোধিতা নয়, প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতার সমন্বয়। লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় জাদুঘর, বিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। হারিয়ে যাওয়া কারুশিল্প, পিঠা, পোশাক, বাদ্যযন্ত্র, কৃষি-উপকরণ ও লোকজ সংস্কৃতিকে নথিভুক্ত করতে হবে। পরিবারে সপ্তাহে অন্তত একটি সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে—যেখানে মোবাইল থাকবে দূরে, মানুষ থাকবে মানুষের কাছে।শিশুকে শুধু প্রযুক্তি শেখালেই হবে না; তাকে গল্প শুনতে, বই পড়তে, প্রকৃতি দেখতে, প্রবীণদের কথা শুনতে এবং নিজের সংস্কৃতিকে জানতে শেখাতে হবে। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় নির্ধারিত হয় না; তার শিকড় কতটা শক্ত, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।আমরা উত্তরাধুনিকতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু অগ্রগতির নামে যদি স্মৃতি হারাই, ঐতিহ্য হারাই, সম্পর্কের উষ্ণতা হারাই, তাহলে সেই অগ্রগতির মানবিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।মানুষ আছে, সম্পর্ক আছে, কথাও আছে—কিন্তু হৃদয়ের কাছে হৃদয় কতটা আছে?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে এখনই। কারণ প্রযুক্তি আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়, স্মৃতি ও ঐতিহ্যের বিকল্প হতে পারে না।
ঢাকা
,
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
আধুনিকতার দৌড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিকড় ও স্মৃতির বাংলাদেশ
-
রুদ্রকন্ঠ ডেস্ক : - আপডেট সময় ০৯:১৬:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
- 14
জনপ্রিয় সংবাদ




















