ঢাকা , মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo সিদ্ধিরগঞ্জে আবাসিক হোটেল শীতলক্ষ্যা থেমে নেই শাহিনের পতিতা ও মাদক ব্যবসা, দেখার যেন কেউ নেই Logo নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থানাধীন নন্দলালপুর, কুতুবপুর ইন্ডাস্ট্রিজ এলাকায় অভিনব কায়দায় সরকারি গ্যাসের বিলের টাকা আত্মসাৎ Logo তিন মাসের ভিসার ফাঁদে সৌদি প্রবাস—দালাল চক্রের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত হাজারো বাংলাদেশি। দালাল চক্র বছরের হাতিয়ে নিচ্ছে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। Logo ছন্নছাড়া ব্যাটিংয়ে নিউজিল্যান্ডের কাছে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ Logo ইরানের সঙ্গে খুব বেশি ‘গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য’ নেই: ট্রাম্প Logo আগামীতে হজের খরচ আরও কমানোর আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর Logo ডিজেলের অভাবে বন্দর ঘাটে ট্রলার বন্ধের আশঙ্কা ইজারাদারের Logo শীতলক্ষ্যাকে বদলাতে না পারলে পরিবর্তন সম্ভব নয়: সাখাওয়াত Logo স্ত্রীকে নিয়ে ঈদে গ্রামে যাবার কথা রানার, বাড়ি ফিরলো লাশ Logo অন্যায়কারী আমার দলের হলেও প্রশ্রয় দেবেন না: এমপি আল আমিন

তিন মাসের ভিসার ফাঁদে সৌদি প্রবাস—দালাল চক্রের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত হাজারো বাংলাদেশি। দালাল চক্র বছরের হাতিয়ে নিচ্ছে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

নিজস্ব প্রতিবেদক: সৌদি আরবে কোম্পানির ভিসার নামে তথাকথিত “সাপ্লাই ভিসা” ব্যবহার করে প্রতারণার এক ভয়াবহ চিত্র সামনে আসছে। তিন মাসের ভিসায় ভালো বেতন ও স্থায়ী চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দালাল চক্র হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে সৌদি আরবে পাঠাচ্ছে। প্রতিটি ভিসার বিপরীতে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা, ফলে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন বহু পরিবার।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালালরা দুই বছরের আকামা ও সম্মানজনক চাকরির আশ্বাস দিলেও বাস্তবে দেওয়া হয় মাত্র তিন মাসের আকামা। সৌদি পৌঁছানোর পর তাদের ভাড়া করা বাসায় রাখা হয়, যেখানে একটি ছোট কক্ষে ৩০ থেকে ৪০ জন পর্যন্ত গাদাগাদি করে বসবাস করতে বাধ্য হন। পরে দালালরা কফি শপ বা বিভিন্ন ঠিকাদারের অধীনে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ জোগাড় করে দেয়।

অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা এক বা দুই মাস কাজ করলেও পুরো বেতন পান না। ঠিকাদাররা তাদের প্রাপ্য মজুরির একটি অংশ দিয়ে বাকিটা আত্মসাৎ করে। কখনও এক মাস কাজ করার পর কোনো বেতন না দিয়েই তাদের বিদায় করে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় দালালরা দায় এড়িয়ে নানা অজুহাত দেখায় এবং নতুন কাজের ব্যবস্থা করার নামে আবারও ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা দাবি করে। ফলে প্রবাসীদের পরিবার সুদে-আসলে ঋণ নিয়ে দালালদের টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়।

তিন মাস শেষে আকামা নবায়ন না হওয়ায় অধিকাংশ শ্রমিক অবৈধ হয়ে পড়েন। বর্তমানে সৌদি আরবে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে বহু বাংলাদেশি বেকার হয়ে পথে পথে ঘুরছেন। অনেকেই ঘরভাড়া দিতে না পেরে রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ চরম দারিদ্র্য ও মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। দেশে ফেরার মতো অর্থ বা বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

প্রতারণার এই চক্র বছরে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার শ্রমিককে সৌদি আরবে পাঠাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিজনের কাছ থেকে গড়ে ৫ লাখ টাকা করে আদায় করলে বছরে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দালালরা। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ শ্রমিক তিন মাসের মধ্যে অবৈধ হয়ে পড়ছেন।

অবৈধ অবস্থায় ধরা পড়লে সৌদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেককে আটক করে জেল খাটানোর পর এক কাপড়ে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। দেশে ফিরে তারা বেকারত্ব ও সামাজিক অবহেলার শিকার হচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের দাবি, সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ঘাটতি রয়েছে। একইভাবে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সৌদি ফেরত শ্রমিকরা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে বারবার এ বিষয়ে অভিযোগ জানালেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত দালাল চক্রকে শনাক্ত করে অবৈধ মানবপাচার বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। এতে অপরাধ, ছিনতাই ও অপহরণের মতো সামাজিক সমস্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি ভবিষ্যতে বৈধ উপায়েও বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সৌদি আরবের শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।

প্রস্তাবিত করণীয়:

অবৈধ দালাল ও মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।

বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।

প্রবাসীদের সুরক্ষায় দূতাবাসের কার্যকর উদ্যোগ বৃদ্ধি।

জনসচেতনতা জোরদার করা এবং প্রতারণা প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এই প্রতারণা দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সিদ্ধিরগঞ্জে আবাসিক হোটেল শীতলক্ষ্যা থেমে নেই শাহিনের পতিতা ও মাদক ব্যবসা, দেখার যেন কেউ নেই

তিন মাসের ভিসার ফাঁদে সৌদি প্রবাস—দালাল চক্রের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত হাজারো বাংলাদেশি। দালাল চক্র বছরের হাতিয়ে নিচ্ছে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

আপডেট সময় ০৩:০০:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: সৌদি আরবে কোম্পানির ভিসার নামে তথাকথিত “সাপ্লাই ভিসা” ব্যবহার করে প্রতারণার এক ভয়াবহ চিত্র সামনে আসছে। তিন মাসের ভিসায় ভালো বেতন ও স্থায়ী চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দালাল চক্র হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে সৌদি আরবে পাঠাচ্ছে। প্রতিটি ভিসার বিপরীতে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা, ফলে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন বহু পরিবার।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালালরা দুই বছরের আকামা ও সম্মানজনক চাকরির আশ্বাস দিলেও বাস্তবে দেওয়া হয় মাত্র তিন মাসের আকামা। সৌদি পৌঁছানোর পর তাদের ভাড়া করা বাসায় রাখা হয়, যেখানে একটি ছোট কক্ষে ৩০ থেকে ৪০ জন পর্যন্ত গাদাগাদি করে বসবাস করতে বাধ্য হন। পরে দালালরা কফি শপ বা বিভিন্ন ঠিকাদারের অধীনে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ জোগাড় করে দেয়।

অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা এক বা দুই মাস কাজ করলেও পুরো বেতন পান না। ঠিকাদাররা তাদের প্রাপ্য মজুরির একটি অংশ দিয়ে বাকিটা আত্মসাৎ করে। কখনও এক মাস কাজ করার পর কোনো বেতন না দিয়েই তাদের বিদায় করে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় দালালরা দায় এড়িয়ে নানা অজুহাত দেখায় এবং নতুন কাজের ব্যবস্থা করার নামে আবারও ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা দাবি করে। ফলে প্রবাসীদের পরিবার সুদে-আসলে ঋণ নিয়ে দালালদের টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়।

তিন মাস শেষে আকামা নবায়ন না হওয়ায় অধিকাংশ শ্রমিক অবৈধ হয়ে পড়েন। বর্তমানে সৌদি আরবে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে বহু বাংলাদেশি বেকার হয়ে পথে পথে ঘুরছেন। অনেকেই ঘরভাড়া দিতে না পেরে রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ চরম দারিদ্র্য ও মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। দেশে ফেরার মতো অর্থ বা বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

প্রতারণার এই চক্র বছরে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার শ্রমিককে সৌদি আরবে পাঠাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিজনের কাছ থেকে গড়ে ৫ লাখ টাকা করে আদায় করলে বছরে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দালালরা। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ শ্রমিক তিন মাসের মধ্যে অবৈধ হয়ে পড়ছেন।

অবৈধ অবস্থায় ধরা পড়লে সৌদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেককে আটক করে জেল খাটানোর পর এক কাপড়ে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। দেশে ফিরে তারা বেকারত্ব ও সামাজিক অবহেলার শিকার হচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের দাবি, সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ঘাটতি রয়েছে। একইভাবে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সৌদি ফেরত শ্রমিকরা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে বারবার এ বিষয়ে অভিযোগ জানালেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত দালাল চক্রকে শনাক্ত করে অবৈধ মানবপাচার বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। এতে অপরাধ, ছিনতাই ও অপহরণের মতো সামাজিক সমস্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি ভবিষ্যতে বৈধ উপায়েও বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সৌদি আরবের শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।

প্রস্তাবিত করণীয়:

অবৈধ দালাল ও মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।

বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।

প্রবাসীদের সুরক্ষায় দূতাবাসের কার্যকর উদ্যোগ বৃদ্ধি।

জনসচেতনতা জোরদার করা এবং প্রতারণা প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এই প্রতারণা দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।