নিজস্ব প্রতিবেদক :: পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলা এসিলেন্ট অফিস ও ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য সাধারন মানুষদের ভোগান্তি দিন দিন বেড়েই চলছে। হতদরিদ্র জমির মালিকরা দালালদের মিষ্টি ভাষার খপ্প পড়ে বাধ্য হচ্ছে দালালদের মাধ্যমেই মিটিশন করতে প্রতিনিয়ত। আর এতে লাভবান হচ্ছে কয়েকজন চিহ্নিত দালাল ও অসাধু কিছু কর্মকর্তা। দালাল চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে গোটা পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলা এসিলেন্ট অফিস ও ভূমি অফিস।
সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলা এসিলেন্ট অফিস ও ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারন ভূক্তভূগিদের। কয়েকেজন অসাধু কর্মকর্তা তাদের মনোনিত দালালের মাধ্যমে অর্থলেনদেন করে অল্প সময় মিটেশন করে দিয়ে দিবে বলে এ প্রতারনা চালিয়ে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, দালালরাই এখন চালাচ্ছে পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলা এসিলেন্ট অফিস ও ভূমি অফিসে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধীক ব্যক্তি সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে জানান, ভূমি মন্ত্রণালয় ও ভূমি অফিসগুলোতে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দালালদের মাধ্যমে দাপ্তরিক কাজ করানোর অভিযোগে বিভিন্ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বরখাস্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং সিসি ক্যামেরা দিয়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে তবে পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলা এসিলেন্ট অফিস ও ভূমি অফিসে কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা ও আশেপাশে কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা ও আশেপাশে থাকা কয়েকটি কম্পিউটার দোকানের দালাল চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে আইনকে তোয়াক্কা না করে এসব জালিয়াতি ও দুর্নীতি কর্মকান্ড চালিয়ে লাভবান হচ্ছে কয়েকটি কম্পিউটার দোকানের দালাল চক্র।
ভূক্তভোগীদের অভিযোগ অনুসন্ধানে জানা যায়, পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলা এসিলেন্ট অফিস ও ভূমি অফিসের ঠিক মেন গেটে বরাবর কম্পিউটারের দোকান দিয়ে করছে দালালি আল-আমিন নামের এই দালাল যার নিজবাড়ী পটুয়াখালীত সদরে । সে রাঙ্গাবালী উপজেলাতে বিবাহ করার সুবাদে রাঙ্গাবালী উপজেলায় তার বর্তমান বসবাস। সে এই কম্পিউটারের দোকান দেওয়ার পূর্বে সিগারেট কোম্পানিতে চাকরি করতো। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে রাঙ্গাবালী ভূমি অফিসের ‘তশিলদার’ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা। কাজী মোঃ জাহিদুল ইসলাম নামের ভূমি অফিসের ‘তশিলদার’ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা যোগদান করে । খোঁজ নিয়ে জানা যায় ওই দালাল আল-আমিন রাঙ্গাবালী ভূমি অফিসের ‘তশিলদার’ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কাজী মোঃ জাহিদুল ইসলামের বাড়ীর পাশের ভাগিনা। সেই সুবাদে রাঙ্গাবালী ভূমি অফিসের ‘তশিলদার’ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কাজী মোঃ জাহিদুল ইসলাম তাকে ভূমি অফিসে তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে নিয়ে নেয়। তারপর তাকে দিয়া দালালি করায়, রাঙ্গাবালী উপজেলার বিভিন্ন চড়ে যার মধ্যে অন্যতম চর হচ্ছে কাউখালী। ঐ রাঙ্গাবালী ভূমি অফিসের ‘তশিলদার’ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কাজী মোঃ জাহিদুল ইসলাম একজন দুর্নীতিবাজ ঘুষখোর ছিলো তাই তিনি আল-আমিন দালাল, মানিক মোল্লা দালাল, আনোয়ার হোসেন দালাল ও কম্পিউটার মাইনুল দালাল এদের সমন্বয়ে অফিসে দুর্নীতি ও দালালির আখড়া বানিয়ে অসংখ্য মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। উল্লেখযোগ্য দুর্নীতি ভূমি বন্দোবস্ত, খাস জমি লীজ, মিউটেশন, এমপি মামলাসহ বিভিন্নভাবে ভূমির সাধারণ গরিব দিনমজুর মালিকগণ হয়রানি করতো মানুষ নিরুপায় হয়ে ছিলো। তৎকালীন সময়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন রাজীব দাশ পুরকায়স্থ। তিনিও এ সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত ছিলেন। একপর্যায়ে সাধারণ জনগণ নিরুপায় হয়ে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ঐ রাঙ্গাবালী ভূমি অফিসের ‘তশিলদার’ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কাজী মোঃ জাহিদুল ইসলামের ও তার সহযোগী দালালদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন শুরু করেন। বিষয়টি তৎকালীন পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন: (ডিসি মহোদয়) অবগত হওয়ার পরে তাৎক্ষণিক রাঙ্গাবালী ভূমি অফিসের ‘তশিলদার’ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কাজী মোঃ জাহিদুল ইসলাম ও রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীব দাশ পুরকায়স্থকে বদলি করেন রাঙ্গাবালী উপজেলা থেকে। তবে থেকে যায় তাদের রেখে যাওয়া দালাল চক্র ওই দালাল চক্রের হয়নি কোন বিচার। পরবর্তীতে রাঙ্গাবালী উপজেলা এসিলেন্ট অফিস ও ভূমি অফিসে ঐ দালাল আল-আমিন ভূমি অফিসের মেইন গেটের সামনে কম্পিউটার দোকান দিয়ে বসে। সেখানে বসেই সে খাস জমি বন্দোবস্ত, খতিয়ান খোলা, দলিলে বিএস দাগ না থাকলে দলিল টেম্পারিং করে বিপুল অংকের টাকা নিয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা এসিলেন্ট অফিস ও ভূমি অফিসের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নামজারি করে দেয়। যাহার ফলশ্রুতিতে ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্রে খুব কম সংখ্যক মানুষ ভূমিসেবা নিতে যান। আল-আমিন দালাল, মানিক মোল্লা দালাল, আনোয়ার হোসেন দালাল ও কম্পিউটার মাইনুল দালাল এদের সমন্বয়ে ভূমি অফিসে দালালি করে নিজেরা আবেদন করে ভূমির মালিককে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ভুলভাল বুঝিয়ে ১১৭০ টাকার পরিবর্তে ১০-২০ হাজার তারও অধিক টাকা নিয়ে মিউটেশন করছেন।
রাঙ্গাবালী উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ (রহমতুল্লাহ ভুক্তভোগীর ছদ্মনাম ) নিরুপায় হয়ে দালালদের খপ্পরে পড়ে তার মিডিশন করার জন্য দালালদের সহযোগিতা নিতে বাধ্য হয়, তাঁর পৈতৃক সাড়ে তিন শতক বসতভিটার একটুখানি নামজারি বা ই-নামজারির কপির জন্য তীব্র তপ্ত রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে একটানা দীর্ঘ অনেকদিন ধরে রাঙ্গাবালী উপজেলা এসিলেন্ট অফিস ও ভূমি অফিসের ঠিক মেন গেটে চায়ের দোকানে মলিন ডায়েরি হাতে বসে আছেন। তিনি বলেন আজ আমার চোখে কোনো আধুনিক প্রযুক্তি বা ক্যাশলেস ডিজিটালাইজেশনের স্বপ্নিল আভা নেই, আছে স্রেফ এক টুকরো পর্চার জন্য পকেট থেকে শেষ সম্বলটুকু খোয়ানোর তীব্র দীর্ঘশ্বাস। অথচ সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে বারবার স্লোগান দেওয়া হচ্ছে যে, ভূমি সেবা এখন সম্পূর্ণ আঙুলের ডগায়, সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই শতভাগ স্বচ্ছতায় খতিয়ান ও দাখিলা পেয়ে যাবেন। এই বৈপ্লবিক রূপান্তরের বাণীর আড়ালে যখন একজন সাধারণ নাগরিককে স্রেফ নিজের ন্যায্য অধিকারটুকু পেতে দালালদের মাধ্যমে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে তহশিলদারের গোপন ড্রয়ার পর্যন্ত টাকা গুনতে হয়, তখন বুঝতে হবে এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ভেতর থেকে কতটা পচে গেছে। রহমতুল্লাহর মতো লাখো নাগরিকের প্রতিদিনের এই নীরব কান্না ও হয়রানি আমাদের তথাকথিত ডিজিটাল স্মার্ট গভার্নেন্সের গালে এক মস্ত বড় চপেটাঘাত এবং এই প্রশাসনিক অন্ধত্ব দূর করার এক জ্বলন্ত দর্পণ।
”চেতনার আঙিনায় সংখ্যার অকাট্য দলিল”
আমরা যদি আমাদের দেশের সামগ্রিক ভূমি প্রশাসন, খতিয়ান জালিয়াতি ও ই-নামজারির আবেদনের গতিপ্রকৃতির বার্ষিক খতিয়ান নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করি, তবে এই অদৃশ্য ওপেন-সিক্রেট বাণিজ্যের তীব্রতা স্পষ্ট বুঝতে পারব। বর্তমান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং জাতীয় ভূমি রাজস্ব বোর্ডের সাম্প্রতিক যৌথ সমীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে ৬৫% মানুষ মনে করেন যে, অনলাইনে আবেদন করার পরেও পর্চা ও নামজারির অনুমোদন পেতে ইউনিয়ন বা উপজেলা ভূমি অফিসে সশরীরে গিয়ে আল-আমিন দালাল, মানিক মোল্লা দালাল, আনোয়ার হোসেন দালাল ও কম্পিউটার মাইনুল দালালদের মত অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা একপ্রকার বাধ্যতামূলক অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার চূড়ান্ত অভাব ও তদারকির দৈন্যদশার পথ অনুসরণ করে ডিজিটাল পোর্টালে আবেদন করার পরেও ম্যানুয়াল বা টেবিলের নিচের ফাইল আটকে রেখে অবৈধ স্পিড মানি বা ঘুস নেওয়ার প্রবণতা গত দুই বছরে অবলীলায় ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের ডেস্কে কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য যোগসাজশে স্রেফ বিএস বা সিএস পর্চায় কৃত্রিম ভুল বা ওভারল্যাপিংয়ের অজুহাত দেখিয়ে, দেশব্যাপী এ পর্যন্ত প্রায় ২৫টি শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক দালাল সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যারা আইনি কাঠামোর ফাঁক গলে কোটি কোটি টাকার সমান্তরাল আন্ডার-টেবিল ঘুষের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। বর্তমানের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ভূমি সংস্কার বোর্ডের বিশেষ সেল থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নামজারি মামলার দৈনিক নিষ্পত্তির খতিয়ানের প্রায় ৭০% ফাইলের পেছনেই রয়েছে কোনো না কোনো গোপন আর্থিক লেনদেন অথবা প্রভাবশালীদের সুপারিশ, যা নির্মমভাবে প্রমাণ করে যে কোনো সাধারণ ফাঁকা ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ দিয়ে মাঠপর্যায়ের এই গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক দুর্নীতিকে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।
আমরা যদি মানবিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও নাগরিক অধিকারের নিখুঁত দৃষ্টিকোণ থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান অনলাইন পোর্টাল ও মাঠপর্যায়ের প্রকৃত বাস্তবতাকে নতুনভাবে পাঠ করি, তবে দেখতে পাব ডিজিটাল পর্চার এই পুরো প্রক্রিয়াটি স্রেফ একটা আধুনিক সফটওয়্যার বা কম্পিউটার স্ক্রিন নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে দেশের কোটি সাধারণ কৃষকের পৈতৃক ভিটেমাটি রক্ষার লড়াই।
আজকের এই টেবিলের নিচের ঘুসের দাপট কোনো কাল্পনিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দেশের শীর্ষ সারির সুশাসন বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের প্রকাশিত ৫০টিরও বেশি দীর্ঘ গবেষণা নিবন্ধের প্রতিটি কলাম ছিল একেকটি প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির বৈপ্লবিক ইশতেহার। কোনো আবেগের বশে বা সস্তা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং কঠিন উপাত্ত, সামষ্টিক পরিসংখ্যানগত যুক্তি ও আন্তর্জাতিক সুশাসনের সূচকের রেফারেন্স দিয়ে ভূমি খাতের এই রূপান্তরের আসল খলনায়কদের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। ডাটা এন্ট্রির ভুল সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষকে ঘোরানোর অন্ধত্ব, সার্ভার ডাউন থাকার ঠুনকো অজুহাতে মূল ফাইল আটকে রাখা এবং ভূমি পরিমাপের যাবতীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এই পুরো খাতের আমূল ও কঠোর সংস্কার প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ঢাকা বা চট্টগ্রামের সাব-রেজিস্ট্রি এবং এসি ল্যান্ড অফিসে যে খতিয়ানগুলোর ডিজিটাল ডেটাবেজে সম্পূর্ণ নির্ভুল থাকার কথা, সেগুলোর প্রিন্ট কপি বা সার্টিফাইড কপি তুলতে গেলেও বিআরএস বা মিউটেশন টেবিলের নিচে স্রেফ কাগজের নোটের জাদুকরী ছোঁয়ার অপেক্ষায় ফাইলগুলো মাসের পর মাস ধুলো মেখে পড়ে থাকে। এই জটিল ও দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ পদ্ধতিতে সাধারণ মানুষকে যে মানসিক ভোগান্তি ও আর্থিক বিপর্যয় পোহাতে হয়, তার বাস্তব চিত্র ও ভুক্তভোগী ক্ষুদ্র জমির মালিকদের দিনলিপি অত্যন্ত বেদনাদায়ক, যার সাথে যুক্ত থাকে প্রতিটি ধাপে দালালের কমিশন, খতিয়ান প্রতি নির্দিষ্ট রেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘুসের এক সুনির্দিষ্ট অদৃশ্য চেইন।
আমাদের দেশের সাধারণ প্রান্তিক চাষীদের একটি বিশাল অংশই কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের ব্যবহার এবং জটিল খতিয়ানের প্যাঁচ বোঝেন না, আর তারা যখন দেখে যে কোনো স্বয়ংক্রিয় অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেবল তহশিলদারের মাসোহারা বা পিয়নের চা-পানির খরচ না দিলে তাদের আবেদনটি বাতিল বা রিজেক্ট করে দেওয়া হয়, তখনই তাদের চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসে। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে, যখন একজন দিনমজুর তার চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের সামান্য জমিটুকু বিক্রি করতে গিয়ে দেখে যে তার ই-নামজারিটি “যাচাইয়ের অপেক্ষাধীন” বলে ঝুলে আছে এবং লোকাল দালালকে তিন হাজার টাকা দেওয়া মাত্রই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সেই খতিয়ান ছাড় পেয়ে যায়, তখন প্রমাণিত হয় যে রূপান্তরটি আসলে কেবল কাগজের পাতায় ও বিজ্ঞাপনেই সীমাবদ্ধ। এই চরম প্রাতিষ্ঠানিক বৈপরীত্য ও সাধারণ নাগরিকের মেধার অবমাননার এক সার্থক রূপকার, যা নিরুপায় মানুষকে বাধ্য করে সোজা ও সৎ পথ ত্যাগ করতে। ভূমি মন্ত্রণালয় যদি স্রেফ টেবিলের সীমানা পেরিয়ে রাজপথে ও প্রতিটি তহশিল অফিসে স্বাধীন অডিট ও কঠোর ডিজিটাল অটোমেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে, তবে আগামী ১০০ বছর পরও যখন এই ভূখণ্ডের ভূমি প্রশাসন, ডিজিটাল রূপান্তর ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা হবে, তখন প্রাতিষ্ঠানিক সততার অভাবের এই কালো দাগটি সেখানে নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করবে।
বিভিন্ন সেক্টরের আমূল রূপান্তর
আজকের এই ভূমি প্রশাসনের রূঢ় বাস্তবতা আমাদের এক জ্বলন্ত সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আজ যদি দেশের প্রতিটি ভূমি অফিস শতভাগ স্বচ্ছ, দালালমুক্ত এবং সম্পূর্ণ ক্যাশলেস স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল চ্যানেলে পরিচালিত হতো, তবে বাংলাদেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর বা খাত সম্পূর্ণ নতুনভাবে বাঁচতে শিখে যেত এবং আমূল পরিবর্তনের ছোঁয়া পেত।
প্রথমত, জাতীয় নীতিনির্ধারণী, বিচার বিভাগ ও দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রিতা দূর করার ক্ষেত্রে এক বিশাল বিপ্লব ঘটত। দেশের আদালতগুলোতে চলমান দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার সিংহভাগই যেহেতু জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ থেকে তৈরি হয়, তাই ভূমি অফিস স্বচ্ছ হলে মামলা জট আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে সরাসরি বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত রায় ও সামাজিক শান্তি পুনরুদ্ধারে অংশ নিত। জমি নিয়ে মারামারি, খুনখারাপি ও পারিবারিক কলহজনিত কারণে গ্রামীণ জনপদের যে বিশাল অর্থনৈতিক ও জানমালের ক্ষতি হয়, তা নিরসনে স্রেফ গালভরা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং সরাসরি নির্ভুল ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল ম্যাপ ও রাষ্ট্রীয় মালিকানা ট্র্যাকিংয়ের ব্যাকআপ দিয়ে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট, আবাসন ও শিল্পায়নের জন্য জমি অধিগ্রহণ খাতের ধারণাই বদলে যেত। নিষ্কণ্টক জমির সহজলভ্যতার হাত ধরে ব্যাংক থেকে গৃহঋণ পাওয়া, জমির ভুয়া দলিল তৈরি, কালোবাজারি ও একই জমি একাধিকবার বিক্রি করার নোংরা খেলা চিরতরে বন্ধ করার সামাজিক ও তাত্ত্বিক মডেল বাস্তবায়িত হতো। স্রেফ ক্ষমতার দাপট নয়, বরং নিরাপদ ভূমি মালিকানা, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) ও টেকসই নগর পরিকল্পনায় মেধার ভিত্তিতে কীভাবে উন্নয়ন করতে হয়, তা পুরো দেশবাসী চাক্ষুষ দেখতে পেত। দেশের আবাসন, ব্যাংকিং ফাইন্যান্স ও কৃষি উৎপাদন খাত আজ সবচেয়ে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও নাগরিক-বান্ধব রোল মডেল হিসেবে রূপান্তরিত হতো। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসত প্রান্তিক কৃষকদের সরকারি ঋণ ও প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে। প্রকৃত জমির মালিকানার ডিজিটাল পর্চা থাকার কারণে কৃষকদের ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ অর্জনে কোনো আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা থাকত না। ভূমি দস্যুদের অবৈধ দখলদারিত্বের অবসান ঘটার কারণে স্বার্থান্বেষী মহলের জাল দলিল তৈরির সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে সাধারণ মানুষের জমি কেড়ে নেওয়ার সাহস পেত না এবং ভূমির প্রকৃত উপাত্তকে দেশের সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরাসরি যুক্ত করার বৈশ্বিক জিআইএস (GIS) নেটওয়ার্ক আজ পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করত।
আজ যদি লাইসেন্সবিহীন এই সমান্তরাল আল-আমিন দালাল, মানিক মোল্লা দালাল, আনোয়ার হোসেন দালাল ও কম্পিউটার মাইনুল দালালদের মত দালালি ও তহশিল অফিসের ওয়ান-স্টপ দুর্নীতি বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করা যেত, তবে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সংস্কারই হতো দেশের সফলতার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি, যা পুরো রাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেত। পর্চার রাজনীতির মূল দর্শনই হলো “ডিজিটাল সিস্টেমকে কৃত্রিমভাবে জটিল বা ধীরগতির বানিয়ে সাধারণ আমজনকে দালালের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করা।”
এই ভূমি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনই বাংলাদেশের সফলতার পথকে সবচেয়ে বেশি ত্বরান্বিত করত। এটি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ একক ক্ষমতা ও আন্ডার-টেবিল ডিলিংসের মাধ্যমে জমির দাখিলা বা খাজনার রসিদ কাটতে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের প্রাচীন সংস্কৃতির অবসান ঘটাত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন প্রবাসী বা চাকুরিজীবী যখন নিজের অর্জিত অর্থ দিয়ে কেনা জমির নামজারি করতে গিয়ে দেখেন যে ডিজিটাল পোর্টালে তার আবেদনটি মাসের পর মাস কোনো কারণ ছাড়াই ঝুলে আছে, অথচ অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো চিহ্নিত দালালকে নির্দিষ্ট অংকের খাম বা স্পিড মানি দেওয়া মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে সার্ভার সচল হয়ে যায় এবং খতিয়ান প্রিন্ট হয়ে আসে, তখন মূলত ব্যবস্থার গলদটাই আমজনতাকে দালালের পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। এই জবাবদিহিতামূলক স্বচ্ছ ডিজিটাল ডেক্সটপ ও সরাসরি থার্ড-পার্টি অডিট টেস্ট ব্যবস্থা আজ দেশব্যাপী মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে আমাদের সামষ্টিক জীবনযাত্রা ও সামাজিক নিরাপত্তা চরম মূল্য দিচ্ছে। একই সাথে, দেশের ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের কাজকর্মে যে গুণগত পরিবর্তন আসত, তা অদক্ষ ও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের কারণে প্রতিদিনের খতিয়ান জালিয়াতি ও সীমানা বিরোধের মামলা পুরোপুরি বন্ধ করে দিত। দালালের কালো থাবার পরিবর্তে জমির প্রকৃত রেকর্ড ও নামজারির অনুমোদন সরাসরি ব্লকচেইন প্রযুক্তির মতো নিরাপদ ডেটাবেজে সংরক্ষিত হলে তা পরিণত হতো দেশের সম্পদ ব্যবস্থাপনার পবিত্রতম কেন্দ্রে। জমির পর্চার রাজনীতি বন্ধের এই একটি মাত্র ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেশের ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে এমন এক স্তরে নিয়ে যেত, যা আন্তর্জাতিক ইজ অব ডুইং বিজনেস বা ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশকে একটি অন্যতম নিরাপদ, বিনিয়োগ-বান্ধব ও স্বনির্ভর জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করত।
প্রাণবন্ত বাস্তবতার উদাহরণ
স্বচ্ছ ই-নামজারি ও আল-আমিন দালাল, মানিক মোল্লা দালাল, আনোয়ার হোসেন দালাল ও কম্পিউটার মাইনুল দালালদের মত সব জায়গায় দালালমুক্ত ডিজিটাল ভূমি সেবা আজ প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিশ্চিত হলে দেশের প্রধান প্রধান ক্ষেত্রগুলো স্রেফ নতুন ভূমি আইন পাসের গণ্ডি পেরিয়ে কীভাবে দৃশ্যমান ও টেকসই উন্নতি করতে হয়, তা বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে শিখিয়ে দিত:
নির্ভুল ও আল-আমিন দালাল, মানিক মোল্লা দালাল, আনোয়ার হোসেন দালাল ও কম্পিউটার মাইনুল দালালদের মত দালালমুক্ত ডিজিটাল পর্চা পাওয়ার মূল ভিত্তি হলো কৃষকদের ফসলি জমির আইনি মালিকানাকে সুরক্ষিত করা। উদাহরণস্বরূপ, কৃষকদের জন্য যদি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা ইউডিসি (UDC) থেকে কোনো অতিরিক্ত ফি বা ঘুস ছাড়াই মাত্র ১৫ মিনিটে জমির খতিয়ান ও খাজনার রসিদ পাওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা তৈরি করা যেত, তার ফলে আজ ক্ষুদ্র কৃষকেরা কোনো মহাজনি ঋণের ফাঁদে না পড়ে সরাসরি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে শস্য ঋণ ও বীজ প্রণোদনার সুযোগ পেত এবং জমি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমার পেছনে কৃষকের সর্বস্বান্ত হওয়া শূন্যের কোঠায় নেমে আসত।
আমাদের মনস্তাত্ত্বিক অঙ্গীকার
আমরা যখন এসি ল্যান্ড অফিসের বারান্দায় ঘুসের টাকা জোগাড় করতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়া অসহায় বিধবা নারীর ছবিগুলো এবং জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া পরিবারের আত্মহননের অकाট্য রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করি, তখন এক তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে আমাদের বুকে। পৈতৃক ভিটাবাড়িটুকু প্রভাবশালী ভূমি দস্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে তহশিলদারের দ্বারে দ্বারে ঘুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঠিক শেষ মুহূর্তে, যখন কোনো বৃদ্ধ পিতার কণ্ঠনালী শেষবারের মতো রুদ্ধ হয়ে আসছিল, তখনও সে অত্যন্ত অস্ফুট কিন্তু দৃঢ় স্বরে কেবল তার সন্তানদের মাথার গোঁজার ঠাঁইটুকু বাঁচিয়ে রাখার আকুতি জানিয়ে গিয়েছিল। তারা বারবার বলে যায়, তাদের এই নীরব প্রশাসনিক হয়রানিকে যেন সাধারণ বা স্বাভাবিক ঘটনা বলে ধামাচাপা না দেওয়া হয় এবং ঘাতক দালাল ও ঘুসের সিন্ডিকেটের রাঘববোয়ালদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হয়।
কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে, সেই অবহেলিত আমজনতার অন্তিম আকুতি আমরা কতটুকু মনে রেখেছি? সামান্য ফাইলের গতি বাড়াতে টেবিলের নিচে ঘুসের টাকা গুঁজে দিয়ে আমরা কি সেই সৎ ও প্রান্তিক নাগরিকদের মেহনতকে অসম্মান করছি না তো? সময়ের আবর্তে আমাদের এই জাতীয় বিবেক ও নাগরিক প্রতিরোধ যেন কোনোভাবেই শিথিল না হয়। আজ যদি আমরা তাদের সেই আকুতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ভূমি অফিসগুলোকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারি, তবে জাতি হিসেবে আমাদের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। এসি ল্যান্ড অফিসের দেয়াল আর দালালের হাতে সাধারণ মানুষের হেনস্থা হওয়ার চিত্র আজ আমাদের অলস বিবেককে চাবুক মারে। অপরাধীদের আড়াল করার যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক অপচেষ্টা বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদাসীনতা হবে দেশের মূল চালিকাশক্তি সাধারণ জনগণের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। তাই দালালি ও ভূমি বাণিজ্যের আসামিদের দ্রুততম সময়ে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাই আজ আমাদের প্রধান জাতীয় ও মনস্তাত্ত্বিক অঙ্গীকার।
এক একনিষ্ঠ প্রতিজ্ঞার রূপরেখা
ভূমির দালাল বাণিজ্য চিরতরে উপড়ে ফেলা এবং তহশিল অফিসের দুর্নীতি থেকে মুক্তি পাওয়া কেবল কোনো নির্দিষ্ট এসি ল্যান্ড বা মন্ত্রণালয়ের একাডেমি কর্মকর্তাদের একক দায়িত্ব নয়। এটি এ দেশের প্রতিটি নাগরিক, সমাজ ও সামগ্রিক জাতির এক পরম ও পবিত্র কর্তব্য।
প্রথমত, প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত কর্তব্য হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো নিজের জমির কাজের জন্য কোনো দালালের পকেটে টাকা না দেওয়া এবং অনলাইনে আবেদন করার পর কোনো কর্মকর্তা অতিরিক্ত টাকা দাবি করলে সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করা। বাস্তব উদাহরণস্বরূপ, কোনো সেবাগ্রহীতার সামনে যদি কোনো তহশিলদার বা কানুনগো সরাসরি ঘুষ দাবি করেন, তবে কোনো ভয় বা সংকোচ না রেখে তা গোপনে রেকর্ড করে সরাসরি দুর্নীতি দমন কমিশনের হটলাইন ১০৬ বা ভূমি মন্ত্রণালয়ের কল সেন্টারে (১৬১২২) তথ্য পৌঁছে দেওয়া উচিত। অনিয়মের বিরুদ্ধে স্রেফ মুখ বুজে দীর্ঘশ্বাস না ফেলে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াকে প্রতিদিনের নাগরিক আচরণে বাঁচিয়ে রাখা প্রতিটি ব্যক্তির প্রাত্যহিক নৈতিক দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক স্তরে আমাদের কর্তব্য হলো ভুমি জালিয়াতি ও দালালি করে জীবিকা নির্বাহকারীদের প্রশ্রয় না দিয়ে এক দুর্ভেদ্য সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। উদাহরণস্বরূপ, সমাজে যারা ভুয়া খতিয়ান তৈরি, অন্যের জমি দখল ও দালালি বাণিজ্যের মাধ্যমে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, সেই চিহ্নিত দালাল, তাদের হুকুমদাতা বা নেপথ্যের কুশীলবদের সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ বয়কট করতে হবে। আমাদের সমাজ যেন কোনো অবস্থাতেই ঘুষ ও চুরির টাকায় কেনা আলিশান গাড়ি-বাড়ির দাপট দেখে এই অপরাধীদের সম্মান বা কোনো ধরনের সামাজিক মর্যাদা ও আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়। পাড়া-মহল্লায় ই-নামজারির সঠিক নিয়ম নিয়ে যুবকদের উদ্যোগে সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক ও লিফলেট বিতরণ গড়ে তোলার মাধ্যমে সমাজকে নিরাপদ রাখাই হবে ভুক্তভোগীদের প্রতি আসল সম্মান।
সর্বোপরি, একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে আমাদের সম্মিলিত কর্তব্য হলো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা তৈরি করা। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে, কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ বা আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের তোয়াক্কা না করে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ এর কঠোর প্রয়োগ এবং দলিল জালিয়াতি চক্রের বিচার প্রক্রিয়া যেন একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতে সম্পন্ন করা নিশ্চিত করা জাতির দায়িত্ব। ভূমির এই সুশৃঙ্খল মালিকানা এবং ভূমি আন্দোলনে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাসকে বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিটি শিশুর মনে সততা ও আইনি শৃঙ্খলার বীজ বুনে দেওয়া যায়। জাতীয়ভাবে প্রতিটি দুর্নীতিগ্রস্ত তহশিলদারের সম্পত্তির নিখুঁত তদন্ত ও দোষীদের বরখাস্তের হিসাবকে রাষ্ট্রীয় দলিল হিসেবে বাঁচিয়ে রাখাই একটি কৃতজ্ঞ জাতির অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।
আল-আমিন দালাল, মানিক মোল্লা দালাল, আনোয়ার হোসেন দালাল ও কম্পিউটার মাইনুল দালালদের কারণে ই-নামজারি ও পর্চা বাণিজ্যের এই তীব্র সংকট আমাদের যা কেড়ে নিয়েছে, তা কোনোদিন কোনো ফাঁকা সরকারি আশ্বাস দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। আজকের এই তীব্র প্রশাসনিক সংকটের সকালে তোমার সেই নিরাপদ ও দালালমুক্ত রাজপথ ও ভূমি অফিসের অপূর্ণ সম্ভাবনাকে আমাদের নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করছি। জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া স্বজনেরা আজ বিচার চেয়ে দেশের অলিতে-গলিতে কাঁদছে সত্যি, আর তাদের বুনে যাওয়া সততা, শৃঙ্খলা আর মেহনতের বীজ আজ কোটি তরুণের ধমনীতে নিরাপদ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আগুন হয়ে জ্বলছে। সিন্ডিকেটের ধার একসময় ক্ষয়ে যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকারের দাবির শক্তি এই সকালে আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার পথ দেখাচ্ছে। ভূমি বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আমাদের কলম ও সচেতনতাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তলোয়ার বানানোর শপথ ও পরম দীক্ষা নিলাম। প্রশাসনিক মুক্তি মানেই তহশিল অফিসের দালালি বাণিজ্যের অবসান, আর বৈধ ই-নামজারি মানেই চিরন্তন ও অবিনাশী এক পরম সামাজিক সমৃদ্ধি। এই সংকট উত্তরণের শেষে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি—হে আল্লাহ, আমাদের দেশের অবহেলিত ও শোষিত প্রান্তিক মানুষের আপনি সহায় হোন এবং দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করুন। ধন্য তোমরা হে অধিকার আদায়ের নির্ভীক সৈনিকেরা, হে দেশের প্রকৃত রক্ষাকবচ, হে চিরকালের পথপ্রদর্শক, শৃঙ্খলার ফেরিওয়ালা, বাংলার অমর সূর্য, তোমরা চিরকাল আলো দেবে আমাদের মাতৃভূমিতে। তোমরাই আমাদের নাগরিক মুক্তির একমাত্র অকুতোভয় ও অবিনাশী নায়ক হয়ে থাকবে চিরকাল!
ঢাকা
,
সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দালালরাই চালাচ্ছে পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলা এসিলেন্ট অফিস ও ভূমি অফিস!
-
রুদ্রকন্ঠ ডেস্ক : - আপডেট সময় ০৪:৩৯:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
- 1
জনপ্রিয় সংবাদ



















