এম এইচ তালুকদার
পেশাগত নিবন্ধন, ‘ডিপ্লোমা ইন ডেন্টাল’ নামকরণ, উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও ১০ম গ্রেডসহ ৪ দফা দাবিতে ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারী শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলন
ঢাকা, ১০ আগস্ট ২০২৬: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রণীত এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক চূড়ান্তকৃত নির্ধারিত ওয়ার্কিং সার্কেলের আলোকে পেশাগত নিবন্ধন প্রদান, ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি (ডেন্টাল) কোর্সের নাম পরিবর্তন করে ‘ডিপ্লোমা ইন ডেন্টাল’ করা, দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পুনরায় চালু, সরকারি শূন্যপদে দ্রুত নিয়োগ, নতুন পদ সৃজন এবং অন্যান্য সমমানের ডিপ্লোমাধারীদের ন্যায় ১০ম গ্রেড প্রদানের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারী শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ১৯৬৩ সাল থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের মাধ্যমে ৪ বছর মেয়াদি ডেন্টাল ডিপ্লোমা কোর্স পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে সরকারি পর্যায়ের ২৩টি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) এবং বেসরকারি পর্যায়ের প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫০০–৬০০ শিক্ষার্থী এ কোর্স সম্পন্ন করছেন। তবে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কোর্সটি পরিচালিত হলেও ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের পেশাগত নিবন্ধন এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন।
বক্তারা বলেন, ১৯৮৩ সাল থেকে ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের পেশাগত নিবন্ধনের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের অধীনে পরিচালিত অন্যান্য সমশিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন ডিপ্লোমাধারীদের বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের মাধ্যমে পেশাগত নিবন্ধন দেওয়া হলেও ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীরা নিবন্ধন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিষয়টিকে তারা বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সংগঠনের আহ্বায়ক তানভীর আহমেদ জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রণীত এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক চূড়ান্তকৃত নির্ধারিত ওয়ার্কিং সার্কেলের আলোকে তৃণমূল পর্যায়ে দন্তসেবা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও পেশাগত নিবন্ধন না থাকায় ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীরা বিভিন্ন ধরনের পেশাগত প্রতিবন্ধকতা ও হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন। বক্তাদের দাবি, রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত ও পরিচালিত ৪ বছর মেয়াদি কোর্স সম্পন্নকারীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট পেশাগত পরিচয় ও নিবন্ধন নিশ্চিত করা জরুরি। সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি (ডেন্টাল) কোর্সের নাম পরিবর্তন করে ‘ডিপ্লোমা ইন ডেন্টাল’ করার বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের চিকিৎসা শিক্ষা-২ শাখা থেকে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সচিবের কাছে মতামত চাওয়া হলে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ সংশ্লিষ্ট ৮টি সরকারি আইএইচটির অধ্যক্ষ ও কোর্স-কো-অর্ডিনেটরদের মতামত নেয়। ৮টি সরকারি আইএইচটির মধ্যে ৭টি আইএইচটির অধ্যক্ষ ও কোর্স-কো-অর্ডিনেটর ‘ডিপ্লোমা ইন ডেন্টাল’ নামকরণের পক্ষে মতামত প্রদান করেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের কাছে পত্র প্রেরণ করে। পরে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের চিকিৎসা শিক্ষা-২ শাখা থেকে মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছেও মতামত চাওয়া হয়। তবে এখনো বিষয়টির কার্যকর নিষ্পত্তি হয়নি বলে বক্তারা জানান।
সংগঠনের মুখপাত্র তানজিনা ইয়াসমিন মারিয়া জানান, ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত রয়েছে। তিনি জানান, দেশের দন্ত সেবার মান উন্নয়নে ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিডিএস ভর্তি যোগ্যতার কিছু শর্ত শিথিল করে ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের বিডিএস কোর্সে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন এবং তাদের জন্য ২টি আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৫–৮৬ শিক্ষাবর্ষে ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের ভর্তির সুযোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। এ বিষয়ে চিত্তরঞ্জন নামে একজন ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এম.ই.এইচ.৩/এম-৪০/৮৪/১০১৪ নং স্মারক, তারিখ ২৫/০৯/১৯৮৫ ইং-এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলেও তারা জানান। এছাড়া ২০০১ সালে ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি), ঢাকার শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পুনরায় চালুর জন্য আবেদন করলে আইএইচটির অধ্যক্ষ স্মারক নং- আইএইচটি/২০-সি/২০০১/১৩৪৪, তারিখ ২৭/১১/২০০১-এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন।
বক্তারা আরো বলেন, ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্নকারীদের জন্য ল্যাটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকলেও ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের জন্য এ ধরনের কার্যকর কাঠামো নেই। তাই তাদের জন্য ল্যাটারাল এন্ট্রি ফ্রেমওয়ার্ক ও প্রয়োজনীয় ক্রেডিট মওকুফ নীতির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পুনরায় চালু করার দাবি জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা জানান, বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের পদসংখ্যা প্রায় ৬৫০টি। বিপরীতে এ পর্যন্ত কোর্স সম্পন্নকারীর সংখ্যা ৫,০০০-এর বেশি। নিয়মিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না হওয়ায় কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা দ্রুত সরকারি শূন্যপদে নিয়োগ, জনস্বাস্থ্যের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃজন এবং অন্যান্য সমমানের ডিপ্লোমাধারীদের ন্যায় ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের চাকরিতে ১০ম গ্রেড প্রদানের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলন শেষে সংগঠনের মুখপাত্র দাবি বাস্তবায়নে সংবাদ সম্মেলন থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচিও ঘোষণা করেন ।
১২ আগস্ট ২০২৬ স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব বরাবর সংশ্লিষ্ট অধ্যক্ষগণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি প্রদান করা হবে।
১৬ আগস্ট ২০২৬ ছাত্র-পেশাজীবী সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে।
১৯ আগস্ট ২০২৬ সংশ্লিষ্ট জেলার প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও ‘র্যালি ফর রিকগনিশন’ কর্মসূচি পালন করা হবে।
২৩ আগস্ট ২০২৬ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে।
৩০ আগস্ট ২০২৬ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন শেষে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে।
বক্তারা বলেন, এসব কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পালন করা হবে। নির্ধারিত কর্মসূচির মধ্যেও যদি তাদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তাহলে ছাত্র-পেশাজীবীদের সমন্বয়ে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, “আমরা কোনো পেশার বিরুদ্ধে নই, আমরা কারও অধিকার কেড়ে নিতে চাই না। আমরা চাই একটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত ৪ বছর মেয়াদি কোর্স সম্পন্ন করার পর আমাদের পেশাগত পরিচয়, নিবন্ধন, উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা হোক।”
তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দীর্ঘদিনের বিষয়গুলো দ্রুত পর্যালোচনা করে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দেশের তৃণমূল পর্যায়ের দন্তসেবা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষিত ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের যথাযথভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।

























