ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুরের জেলা প্রশাসককে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালিগালাজ করার অভিযোগ উঠেছে কাউলীবেড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের একটি দলকে ভাঙ্গা উপজেলা ভূমি অফিসে প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট অবরুদ্ধ করে রাখা, মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা জোর করে নিয়ে নেওয়া এবং ধারণ করা ভিডিও-অডিও মুছে ফেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি নিয়ে সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ভূমিসেবা সংক্রান্ত অনিয়ম এবং জেলা প্রশাসককে নিয়ে কথিত অশালীন মন্তব্যের বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে আকস্মিকভাবে একদল ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
সাংবাদিকদের দাবি, তারা ভাঙ্গা উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে কাউলীবেড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগ, ভিডিও ও অডিও বক্তব্য দেখাচ্ছিলেন এবং লিখিত অভিযোগের কপি জমা দিচ্ছিলেন। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসককে নিয়ে সালমার কথিত অশ্লীল মন্তব্যের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়।
প্রথমদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও পরে হঠাৎ কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে এসে সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন ও নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত প্রাইভেট পেন-ক্যামেরা নিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের ধারণ করা ভিডিও ও অডিওর কিছু অংশ মুছে ফেলা হয়। একটি মেমোরি কার্ড পরবর্তীতে ভাঙ্গা উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার কাছে আমানত হিসেবে রাখা হয় বলে তারা জানান।
মহিলা সাংবাদিককে শারীরিকভাবে তল্লাশির অভিযোগ
ঘটনার সময় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গেও অশোভন আচরণের অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকদের দাবি, নারী সাংবাদিক কুমকুমের গলা ও বুকের কাছে হাত দিয়ে তল্লাশি করা হয়—তার কাছে আরও কোনো ক্যামেরা বা রেকর্ডিং ডিভাইস রয়েছে কি না, তা খোঁজার চেষ্টা করা হয়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সাংবাদিকরা ফোনে ফরিদপুর জেলা প্রশাসক ও ভাঙ্গা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন বলে জানান। পরবর্তীতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং ভূমি সহকারীর কর্মকর্তার ও সাংবাদিকদের সহযোগিতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সাংবাদিকরা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।
ছয় মাস ধরে ভূমিসেবা নিয়ে হয়রানির অভিযোগ
সাংবাদিক মোঃ হাফিজুল ইসলাম তালুকদারের অভিযোগ, কাউলীবেড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সালমা আক্তারের কার্যালয়ে ভূমিসেবা নিতে গিয়ে তিনি প্রায় ছয় মাস ধরে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন।
তার দাবি, ছয় শতাংশ জমির একটি দলিলের বিপরীতে ভুলভাবে মাত্র ০.৭৬ অযুতাংশ জমি নামজারি করা হয়। বিষয়টি জানতে চাইলে সংশোধনের জন্য পুনরায় আবেদন করতে বলা হয় এবং খরচের কথাও বলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরবর্তীতে একই মৌজা, একই দাগ ও একই খতিয়ানের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একাধিক দলিলের জন্য পৃথক পৃথক নামজারি করতে বলা হয় এবং প্রতিটি নামজারির জন্য ছয় হাজার টাকা করে মোট ২৪ হাজার টাকা খরচ হবে বলে তাকে জানানো হয়—এমন অভিযোগও করেছেন তিনি।
এ নিয়ে আপত্তি জানালে নামজারির আবেদন না করার কথা বলা হয় বলে সাংবাদিক হাফিজুল ইসলাম তালুকদার দাবি করেন। পরে তিনি স্থানীয় কম্পিউটার দোকান থেকে একাধিকবার নামজারির আবেদন করার চেষ্টা করেন। তার অভিযোগ, প্রতিবারই নতুন নতুন ভুল-ত্রুটির কথা বলে তাকে ঘুরানো হয়।
একপর্যায়ে বিষয়টি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও জেলা প্রশাসককে জানানোর কথা বলার পর তার নামজারি সংক্রান্ত কাজ এগিয়ে দেওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েই বিপত্তি
দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অফিসে যাতায়াতের কারণে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভূমিসেবা নিয়ে হয়রানি ও অর্থ দাবির অভিযোগের বিভিন্ন ভিডিও ও অডিও সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানান সাংবাদিক হাফিজুল ইসলাম তালুকদার।
তিনি বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট পর্যায়েও বিষয়টি অবহিত করেছেন বলে জানান।
এরপর জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার সহযোগিতায় ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন ভূমি অফিসে তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি সাংবাদিক দল কাজ শুরু করে।
দলের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন দৈনিক রুদ্র খবর অনলাইন নিউজ পোর্টালের নির্বাহী সম্পাদক ও অবসরপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক এম আর মজুমদার, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি সাংবাদিক কুমকুম, সাংবাদিক রাজিয়া সুলতানা তূর্ণা এবং সাংবাদিক মোঃ হাফিজুল ইসলাম তালুকদার।
বক্তব্য নিতে গিয়ে অবরুদ্ধ
সাংবাদিকদের দাবি, তারা প্রথমে ভাঙ্গা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়ে প্রশাসনিক সহযোগিতা ও সাধারণ ডায়েরি সংক্রান্ত পরামর্শ নেন। পরে ভাঙ্গা উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার উদ্যোগ নেন।
সেখানে লিখিত অভিযোগের কপি জমা দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন মানুষের বক্তব্যের ভিডিও ও অডিও দেখানো হয়। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসককে নিয়ে সালমার কথিত অশ্লীল মন্তব্যের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়।
সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তাদের অপেক্ষা করতে বলা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার একপর্যায়ে হঠাৎ কয়েকজন ব্যক্তি এসে তাদের মোবাইল ও ক্যামেরা নিয়ে নেন এবং নানা ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দেন। পরে দীর্ঘ সময় তাদের সেখানে অবস্থান করতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ।
সাংবাদিকদের মধ্যে আতঙ্ক, ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত
ঘটনার পর নারী সাংবাদিকসহ দলের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ফলে ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কাছে সরাসরি গিয়ে বক্তব্য নেওয়া ও লিখিত আবেদন দেওয়ার কর্মসূচিও তারা বাতিল করেন।
পরবর্তীতে তারা ঢাকায় ফিরে এসে বিষয়টি জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, ঢাকা প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন ও সহকর্মীদের অবহিত করেন।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, তথ্য সংগ্রহের স্বাধীনতা এবং সরকারি দপ্তরে সংবাদ সংগ্রহের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
তদন্তের দাবি
সাংবাদিকদের অভিযোগ, একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ঘিরে জেলা প্রশাসক সম্পর্কে কথিত অশ্লীল মন্তব্য, সাধারণ মানুষের ভূমিসেবা নিয়ে হয়রানি ও অর্থ দাবির অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করে মোবাইল-ক্যামেরা নিয়ে ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগ—সবগুলো বিষয়ই অত্যন্ত গুরুতর।
তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সালমা আক্তারের কথিত বক্তব্যের সত্যতা, সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করার ঘটনা, মোবাইল ও ক্যামেরা নেওয়া, ভিডিও-অডিও মুছে ফেলা এবং নারী সাংবাদিকের সঙ্গে কথিত অশোভন আচরণের বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকরা।
একাধিকবার হোয়াটসঅ্যাপে কল ও মেসেজ দিয়ে ঘটনাটির বিষয়বস্তু জানাতে ডিসিকে পাওয়া যায় না,বাধ্য হয়ে বেশকিছু প্রমাণাদি ডিসি সাবের হোয়াটসঅ্যাপে দেয়া হয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ভূমি ইউনিয়ন সহকারী কর্মকর্তা সালমা আক্তারের বক্তব্য নিতে গেলে ফোন কেটে দেয়, পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।




















