ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo মুছাপুরে প্রবাসী সাংবাদিক পরিবারকে হয়রানি: বাড়ি দখলের পাঁয়তারায় ‘লেডি মাস্তান’ হনুফা Logo সোনারগাঁয়ের জামপুরে তালতলা ফাঁড়ির নাম ভাঙিয়ে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ Logo কুতুবপুর লাকী বাজার থেকে যুবলীগ নেতা সোনালী গ্রেফতার; তদবিরে সহদর দুই ভাই যুবদল নেতার দৌড়ঝাঁপ Logo কাঁচপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ! পর্দার আড়ালে সাপ্তাহিক চাঁদার কারবার? Logo বন্দরে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২) ইউনিয়ন পর্যায়ে খেলোয়াড় বাছাইয়ের উদ্বোধন Logo নারায়ণগঞ্জে হেভেন কম্পিউটারের কর্ণধার মোঃ মাকসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ক্রেতা হয়রানির অভিযোগ, সদর থানায় জিডি Logo রাসেল হত্যা মামলা: শামীম ওসমানদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য শুরু Logo শ্রমিকদের আন্দোলন নেই, সতর্ক অবস্থানে পুলিশ-বিজিবি Logo নারায়ণগঞ্জ: এইচএসসিতে কমেছে পাসের হার ও জিপিএ-৫ Logo শহরে বেপরোয়া উৎসব বাসের চাপায় রিকশাচালক নিহত, আহত ৩

তল্লা মসজিদ বিস্ফোরণের ছয় বছর পরও স্বজনদের মনে সেই ভয়াবহ রাতের ক্ষত

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণের ছয় বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এশার নামাজের সময় ঘটে যাওয়া ওই দুর্ঘটনায় ৩৭ জন দগ্ধ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁদের মধ্যে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়।

ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও তল্লা মসজিদের সেই ভয়াবহ রাতের স্মৃতি এখনো স্বজন ও স্থানীয় মানুষের মনে গভীর বেদনার হয়ে আছে। নামাজরত মুসল্লিদের ওপর আকস্মিকভাবে নেমে আসা আগুনের সেই ঘটনা নারায়ণগঞ্জবাসীর স্মৃতিতে আজও দগদগে।

২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাতে পশ্চিম তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজ আদায় করছিলেন মুসল্লিরা। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে মসজিদের ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ফরজ নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেও কয়েকজন তখনও সুন্নতসহ অন্যান্য নামাজ আদায় করছিলেন। ঠিক তখনই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

 

তদন্তে উঠে আসে, মসজিদের মেঝের নিচ দিয়ে যাওয়া গ্যাসের পাইপলাইনে লিকেজ ছিল। ওই লিকেজ দিয়ে গ্যাস মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে জমতে থাকে। দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় জমে থাকা গ্যাস বের হওয়ার সুযোগ পায়নি।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বিস্ফোরণের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয় গ্যাসের লিকেজ, মসজিদের আবদ্ধ পরিবেশ এবং বৈদ্যুতিক লাইনের চেঞ্জওভার।

তদন্তে আরও উঠে আসে, দুর্ঘটনার দিন সকাল থেকেই মসজিদ এলাকায় গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। তবে গ্যাসের উৎস শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ৮টা ৪৫ মিনিটে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যায়। এ সময়ও মসজিদের ভেতরে কয়েকজন মুসল্লি নামাজ আদায় করছিলেন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর মসজিদের মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন বৈদ্যুতিক লাইনের সংযোগ পরিবর্তন করতে গেলে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়। এর আগেই মসজিদের ভেতরে গ্যাস জমে ছিল। ওই স্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে জমে থাকা গ্যাসে আগুন ধরে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে তা পুরো মসজিদে ছড়িয়ে পড়ে।

 

দুর্ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে মসজিদের নিচতলায় থাকা ছয়টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বিস্ফোরণের ধারণা সামনে আসে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর সংযোগ চালু করার সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে জমে থাকা গ্যাসে আগুন ধরে থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হয়েছিল।

তবে পরবর্তী তদন্তে দুর্ঘটনার কারণ বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত গ্যাসের লিকেজ, মসজিদের আবদ্ধ পরিবেশ এবং বৈদ্যুতিক লাইনের চেঞ্জওভারকে বিস্ফোরণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

মসজিদটি নিচু এলাকায় অবস্থিত হওয়া এবং আশপাশের রাস্তা সরু থাকায় দগ্ধ ও আহতদের দ্রুত সরিয়ে নিতে সমস্যা হয়। একই সঙ্গে উদ্ধারকারী দলগুলোর কাজ পরিচালনাতেও নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।

মসজিদ বিস্ফোরণের ঘটনায় দায় নির্ধারণে আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়। তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ২৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি আদালতে আত্মসমর্পণের পর ২২ জন আসামিকে জামিন দেওয়া হয়।

তল্লা মসজিদের ঘটনা গ্যাস ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাও সামনে নিয়ে আসে। কোনো ভবন বা উপাসনালয়ে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে তা অবহেলা না করে দ্রুত গ্যাসের উৎস শনাক্ত করা জরুরি। গ্যাস জমে থাকার আশঙ্কা থাকলে বৈদ্যুতিক সুইচ, সংযোগ বা অন্য কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরির ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে হবে। পাশাপাশি ভবন ও উপাসনালয়ে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও তল্লা মসজিদের সেই রাতের স্মৃতি স্বজন ও স্থানীয় মানুষের মনে এখনো গভীর বেদনার হয়ে আছে। নামাজরত মানুষের ওপর আকস্মিকভাবে নেমে আসা আগুনের সেই ঘটনা আজও মনে করিয়ে দেয় গ্যাস ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তায় সামান্য অবহেলাও ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ পরিণতি।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মুছাপুরে প্রবাসী সাংবাদিক পরিবারকে হয়রানি: বাড়ি দখলের পাঁয়তারায় ‘লেডি মাস্তান’ হনুফা

তল্লা মসজিদ বিস্ফোরণের ছয় বছর পরও স্বজনদের মনে সেই ভয়াবহ রাতের ক্ষত

আপডেট সময় ০৪:২১:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণের ছয় বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এশার নামাজের সময় ঘটে যাওয়া ওই দুর্ঘটনায় ৩৭ জন দগ্ধ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁদের মধ্যে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়।

ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও তল্লা মসজিদের সেই ভয়াবহ রাতের স্মৃতি এখনো স্বজন ও স্থানীয় মানুষের মনে গভীর বেদনার হয়ে আছে। নামাজরত মুসল্লিদের ওপর আকস্মিকভাবে নেমে আসা আগুনের সেই ঘটনা নারায়ণগঞ্জবাসীর স্মৃতিতে আজও দগদগে।

২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাতে পশ্চিম তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজ আদায় করছিলেন মুসল্লিরা। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে মসজিদের ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ফরজ নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেও কয়েকজন তখনও সুন্নতসহ অন্যান্য নামাজ আদায় করছিলেন। ঠিক তখনই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

 

তদন্তে উঠে আসে, মসজিদের মেঝের নিচ দিয়ে যাওয়া গ্যাসের পাইপলাইনে লিকেজ ছিল। ওই লিকেজ দিয়ে গ্যাস মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে জমতে থাকে। দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় জমে থাকা গ্যাস বের হওয়ার সুযোগ পায়নি।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বিস্ফোরণের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয় গ্যাসের লিকেজ, মসজিদের আবদ্ধ পরিবেশ এবং বৈদ্যুতিক লাইনের চেঞ্জওভার।

তদন্তে আরও উঠে আসে, দুর্ঘটনার দিন সকাল থেকেই মসজিদ এলাকায় গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। তবে গ্যাসের উৎস শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ৮টা ৪৫ মিনিটে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যায়। এ সময়ও মসজিদের ভেতরে কয়েকজন মুসল্লি নামাজ আদায় করছিলেন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর মসজিদের মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন বৈদ্যুতিক লাইনের সংযোগ পরিবর্তন করতে গেলে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়। এর আগেই মসজিদের ভেতরে গ্যাস জমে ছিল। ওই স্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে জমে থাকা গ্যাসে আগুন ধরে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে তা পুরো মসজিদে ছড়িয়ে পড়ে।

 

দুর্ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে মসজিদের নিচতলায় থাকা ছয়টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বিস্ফোরণের ধারণা সামনে আসে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর সংযোগ চালু করার সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে জমে থাকা গ্যাসে আগুন ধরে থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হয়েছিল।

তবে পরবর্তী তদন্তে দুর্ঘটনার কারণ বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত গ্যাসের লিকেজ, মসজিদের আবদ্ধ পরিবেশ এবং বৈদ্যুতিক লাইনের চেঞ্জওভারকে বিস্ফোরণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

মসজিদটি নিচু এলাকায় অবস্থিত হওয়া এবং আশপাশের রাস্তা সরু থাকায় দগ্ধ ও আহতদের দ্রুত সরিয়ে নিতে সমস্যা হয়। একই সঙ্গে উদ্ধারকারী দলগুলোর কাজ পরিচালনাতেও নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।

মসজিদ বিস্ফোরণের ঘটনায় দায় নির্ধারণে আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়। তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ২৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি আদালতে আত্মসমর্পণের পর ২২ জন আসামিকে জামিন দেওয়া হয়।

তল্লা মসজিদের ঘটনা গ্যাস ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাও সামনে নিয়ে আসে। কোনো ভবন বা উপাসনালয়ে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে তা অবহেলা না করে দ্রুত গ্যাসের উৎস শনাক্ত করা জরুরি। গ্যাস জমে থাকার আশঙ্কা থাকলে বৈদ্যুতিক সুইচ, সংযোগ বা অন্য কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরির ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে হবে। পাশাপাশি ভবন ও উপাসনালয়ে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও তল্লা মসজিদের সেই রাতের স্মৃতি স্বজন ও স্থানীয় মানুষের মনে এখনো গভীর বেদনার হয়ে আছে। নামাজরত মানুষের ওপর আকস্মিকভাবে নেমে আসা আগুনের সেই ঘটনা আজও মনে করিয়ে দেয় গ্যাস ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তায় সামান্য অবহেলাও ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ পরিণতি।